চরিত্রসমূহ:
১. আসলাম (৩৫): বড় ভাই। সরকারি বা কর্পোরেট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। একটু অহংকারী, তবে স্ত্রীর কথায় ওঠাবসা করে।
২. সুলতানা (৩০): বড় ভাইয়ের বউ। অহংকারী, লোভী এবং সংসারের সব অশান্তির মূল।
৩. আরিফ (২৮): ছোট ভাই। সৎ, শান্ত এবং অল্প আয়ের চাকরি বা ফ্রিল্যান্সিং করে।
৪. মিতু (২৩): ছোট ভাইয়ের বউ। ধৈর্যশীল, পরোপকারী ও বাস্তববাদী।
৫. মা (৬০): দুই ভাইয়ের বৃদ্ধ মা (প্রয়োজনে রাখা হয়েছে গভীরতা তৈরির জন্য)।
দৃশ্য ১
স্থান: ড্রয়িং রুম ও ডাইনিং টেবিল।
সময়: সকাল।
(টেবিলে নাস্তা সাজানো। সুলতানা দামি শাড়ি পরে বসে আছে। মিতু রান্নাঘর থেকে চা আর রুটি নিয়ে আসছে। আসলাম ডাইনিং টেবিলে বসে মোবাইল দেখছে। আরিফ তাড়াহুড়ো করে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে।)
সুলতানা: (চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুখ বাঁকিয়ে) মিতু, চায়ের চিনিটা আজকেও কম হয়েছে। কতবার বলব, একটু রয়েসয়ে কাজ করবে? নাকি আমাদের টাকায় চিনি কেনা হয় বলে ইচ্ছে করে নষ্ট করছ?
মিতু: (নম্রভাবে) না আপা, ভাইয়ার ডায়াবেটিসের কথা চিন্তা করে চিনিটা একটু কম দিয়েছি। আপনার কাপে আলাদা চিনি দেব?
সুলতানা: লাগবে না। বাহানার তো শেষ নেই। নিজেরা তো সংসারে একটা টাকাও দিতে পারো না, শুধু বড় ভাইয়ের ঘাড়ে বসে খাওয়া!
আরিফ: (জুতো পরতে পরতে) ভাবি, আমি কিন্তু প্রতি মাসে আমার সাধ্যমতো বাজারের টাকা দিই। হ্যাঁ, ভাইয়ার মতো অত দিতে পারি না, তবে একদম দিই না—এটা বলা ভুল।
আসলাম: (ভাব নিয়ে) থাক আরিফ, তর্ক করো না। তোমার ভাবি ভুল কিছু বলেনি। এই যে ফ্ল্যাটের ভাড়া, এসি, কারেন্ট বিল—সব তো একাই আমাকে টানতে হয়। তোমার ওই সামান্য ১০-১৫ হাজার টাকার চাকরিতে কি আর সংসার চলে?
মিতু: ভাইয়া, আমরা তো আলাদা হতে চেয়েছিলাম। আপনারাই তো বললেন একসাথে থাকতে।
সুলতানা: ওহ, এখন আবার আমাদের দোষ? আলাদা থাকার মুরোদ আছে নাকি তোমাদের? এই শহরে বাড়ি ভাড়া দিয়ে তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পারতে না! আসলাম, তুমি এদের বেশি মাথায় তুলছ।
আসলাম: বাজারটা আজ একটু ভালো করে করো আরিফ। আমার ক্লায়েন্ট আসবে রাতে। আর সুলতানা, তোমার জন্য ওই গয়নাটা আজই বুকিং দিয়ে দেব।
সুলতানা: (খুশি হয়ে) থ্যাংক ইউ জান! শুনলে তো মিতু? একেই বলে পুরুষ মানুষ। কামাই করতে জানতে হয়।
(আরিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিতুর দিকে তাকায়। মিতু ইশারায় শান্ত হতে বলে। আরিফ বেরিয়ে যায়।)
দৃশ্য ২
স্থান: আরিফ ও মিতুর বেডরুম।
সময়: রাত।
(আরিফ ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে আছে। মিতু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।)
আরিফ: মিতু, মাঝে মাঝে নিজেকে খুব ব্যর্থ মনে হয়। বড় ভাবির ওই কথাগুলো আর সহ্য হয় না। ভাইয়াও কেমন যেন বদলে গেছে। টাকার গরমে অন্ধ।
মিতু: তুমি মন খারাপ করো না। মানুষের দিন সবসময় একরকম যায় না। তুমি তো সততার সাথে চেষ্টা করছ। ভাইয়ার চাকরিটা বড়, কিন্তু আমার কেন যেন ইদানীং ভয় করে।
আরিফ: কেন, কী হয়েছে?
মিতু: ভাইয়া ইদানীং বাসায় অনেক ক্যাশ টাকা নিয়ে আসে। সেদিন আলমারিতে দেখলাম লাখ লাখ টাকা। একজন সৎ চাকরিজীবীর কাছে এত নগদ টাকা থাকার কথা নয়।
আরিফ: আমি ভাইয়াকে বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু ভাইয়া উল্টো আমাকে ধমক দিয়ে বলেছে—"আগে টাকা কামাতে শেখ, তারপর জ্ঞান দিবি।" স্রষ্টা সবাইকে হেদায়েত করুন।
দৃশ্য ৩
স্থান: আসলামের ড্রয়িং রুম।
সময়: বিকেল (কয়েক মাস পর)।
(ড্রয়িং রুমে আসলাম ও সুলতানা বসে আছে। সুলতানার হাতে বেশ কিছু নতুন শপিং ব্যাগ। সে খুব উৎফুল্ল।)
সুলতানা: এই দেখো আসলাম, আজ এই ডায়মন্ডের নেকলেসটা কিনলাম। ভাবি দেখলেই একদম হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরবে।
আসলাম: (একটু চিন্তিত, মোবাইলে বারবার কল দেখছে) হুম, ভালো। তবে সুলতানা, ইদানীং অফিস থেকে একটু চাপ আসছে। অডিটর বসেছে।
সুলতানা: ধুর! ওসব অডিট-ফডিট প্রতি বছরই আসে। তুমি তো ম্যানেজ করতে জানোই। আচ্ছা, মিতুকে দিয়ে এক কাপ কফি পাওয়া যাবে? ওর আবার শরীর খারাপ নাকি, ঘরে বসে আছে।
(ঠিক এই সময় দরজার বেল বেজে ওঠে। মিতু দরজা খোলে। হুড়মুড় করে সিভিল ড্রেসে চার-পাঁচজন পুলিশ এবং আসলামের অফিসের ডিরেক্টর ভেতরে ঢোকেন।)
অফিসার: আসলাম সাহেব কে?
আসলাম: (কেঁপে উঠে) হ্যাঁ, আমি। কী ব্যাপার?
ডিরেক্টর: আসলাম সাহেব, আপনার বিরুদ্ধে অফিসের ৫০ লাখ টাকা তছরুপ এবং ঘুষ নেওয়ার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। ম্যানেজমেন্ট আপনাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে এবং পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
সুলতানা: (চিৎকার করে) কী বলছেন এসব! ভুল হচ্ছে কোথাও! আমার স্বামী এমন করতেই পারে না!
অফিসার: আমাদের কাছে ওয়ারেন্ট আছে। আসলাম সাহেব, চলুন।
(পুলিশ আসলামকে হাতকড়া পরায়। আসলাম মাথা নিচু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সুলতানা সোফায় বসে পড়ে কাঁদতে থাকে। মিতু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।)
দৃশ্য ৪
স্থান: ড্রয়িং রুম (আসলামের গ্রেফতারের এক মাস পর)।
সময়: দুপুর।
(ঘরটা এখন ফাঁকা ও নিস্তব্ধ। দামি সোফা বা শোপিসগুলো নেই, ঋণ শোধ করতে বিক্রি করা হয়েছে। সুলতানা সাধারণ একটা সুতি শাড়ি পরে মুখ কালো করে বসে আছে। মিতু ঘর গুছাচ্ছে।)
সুলতানা: (কান্নাজড়িত কণ্ঠে) আমার কপালটাই পুড়ল। আসলামের জামিনও হচ্ছে না, জমানো সব টাকা উকিল আর দেনা শোধ করতেই শেষ। এই ফ্ল্যাটের ভাড়াই বা কে দেবে? আমাদের তো না খেয়ে রাস্তায় বসতে হবে!
মিতু: (সুলতানার পাশে এসে মাথায় হাত রাখে) ভাবি, ভেঙে পড়বেন না। আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। ভাইয়ার এই শাস্তিটা হয়তো উনাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে। আর আমরা তো রাস্তায় বসিনি, আমরা আছি তো।
সুলতানা: (মুখ সরিয়ে নিয়ে) তোমরা? আরিফের ওই সামান্য টাকায় এই সংসার চলবে? এখন তো তোমরা আমাদের তাড়িয়ে দেবে, আমি জানি। আমি তোমার সাথে যা ব্যবহার করেছি...
মিতু: আমরা তেমন মানুষ নই ভাবি। বিপদে পরিবারই তো পরিবারের পাশে দাঁড়ায়।
দৃশ্য ৫
স্থান: ডাইনিং টেবিল।
সময়: রাত।
(টেবিলে খুব সাধারণ ডাল, ভাত আর সবজি। আরিফ অফিস থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসে। মিতু খাবার বেড়ে দিচ্ছে। সুলতানা অপরাধীর মতো এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।)
আরিফ: ভাবি, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন, একসাথে খাই।
সুলতানা: না আরিফ, তোমরা খাও। আমার ক্ষুধা নেই।
আরিফ: শুনুন ভাবি। অতীত ভুলে যান। ভাইয়া অন্যায় করেছিল, তার শাস্তি হচ্ছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমাদের সংসার ভেঙে যাবে। আমি এই এক মাসে আমার চাকরিতে প্রমোশন পেয়েছি, পাশাপাশি একটা পার্ট-টাইম প্রজেক্টের কাজ পেয়েছি। এখন থেকে সংসারের দায়িত্ব আমার।
সুলতানা: (চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে) আমাকে মাফ করে দাও আরিফ। আমি টাকার গরমে অন্ধ হয়ে তোমাদের কত অপমান করেছি। আর আজকে আমার এই বিপদে তোমরাই আমাকে আগলে রাখলে!
আরিফ: আপনি আমার বড় ভাবি, মায়ের মতো। আর মিতু, তুমি কালকেই এই ফ্ল্যাট ছেড়ে আমাদের বাজেটের মধ্যে একটা ছোট কিন্তু সুন্দর ফ্ল্যাট দেখে রাখবে। আমরা নতুন করে শুরু করব।
মিতু: (হেসে) আমি আজকেই একটা ফ্ল্যাট দেখে এসেছি। ঘরটা ছোট, কিন্তু আমাদের সবার মনটা বড় হলে ওখানেই অনেক সুখ হবে।
(সুলতানা মিতুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আরিফ মিতুর দিকে তাকিয়ে হাসে। একটা সুন্দর পারিবারিক আবহের মধ্য দিয়ে নাটকটি শেষ হয়।)
...সমাপ্ত...
