নাটকের নাম: বেহিসেবি বউ
ধরন: পারিবারিক কমেডি ও সচেতনতামূলক
সময়কাল: ১ ঘণ্টা (অন-স্ক্রিন সময়)
প্রধান চরিত্রসমূহ:
১. আরিফ (৩২): মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসারী ও হিসেবি ছেলে। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে।
২. নীলা (২৫): আরিফের স্ত্রী। প্রচণ্ড শৌখিন, ট্রেন্ড-প্রেমী এবং মারাত্মক ‘বেহিসেবি’।
৩. আমেনা বেগম (৫৫): আরিফের মা। পরহেজগার এবং পুরোনো আমলের মিতব্যয়ী নারী।
৪. রতন (২২): আরিফের ছোট ভাই। কিছুটা ফচকে এবং ভাবির অন্যায় খরচের গোপন পার্টনার।
দৃশ্য ১: বসার ঘর (সকাল)
(বসার ঘরের টেবিলজুড়ে অনলাইনের শপিং ডেলিভারির প্যাকেট ছড়ানো। নীলা একের পর এক প্যাকেট খুলছে। পাশেই আরিফ কপালে হাত দিয়ে বসে আছে। আমেনা বেগম জায়নামাজ গুটিয়ে ঢুকছেন।)
আরিফ: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) নীলা, এই নিয়ে চলতি মাসে তোমার ১৭ নম্বর পার্সেল আসলো। আলমারিতে জায়গা নেই, খাটের নিচে জায়গা নেই। এবার কি আমি বারান্দায় ঘুমাবো?
নীলা: (একটি জমকালো শাড়ি বের করতে করতে) আহা আরিফ, বোঝো না কেন? এটা ‘লাইভ সেল’-এ অফারে পেয়েছি। অরিজিনাল দাম ৫০০০ টাকা, আমি পেয়েছি মাত্র ৪৩৯৯ টাকায়! পুরো ৬০১ টাকা সেভ করেছি!
আরিফ: (হিসেব করে) কিন্তু এই শাড়িটা কি তোমার খুব দরকার ছিল?
নীলা: দরকার মানে? আগামী মাসে আমার খালাতো বোনের ননদের বিয়ে। সেখানে কি আমি খালি গায়ে যাবো?
আমেনা বেগম: (এগিয়ে এসে) বউমা, ছয় মাস আগেও একটা দামি শাড়ি কিনলে। ওটা তো একবারের বেশি পরোনি। একটু হাত গুটিয়ে খরচ করো মা, আরিফ একা কামায়।
নীলা: আম্মা, আপনারা তো যুগের ট্রেন্ড বোঝেন না। এক শাড়ি পরে দুবার ছবি তুললে ফেসবুকের ফ্রেন্ডরা হাসাহাসি করবে।
(এমন সময় রতন ঘরে ঢোকে হাতে আরও একটি বড় বক্স নিয়ে)
রতন: ভাবি! তোমার আরও একটা পার্সেল এসেছে। ক্যাশ অন ডেলিভারি, ৩২০০ টাকা।
আরিফ: (লাফিয়ে উঠে) কী! আবার? এবার কী এনেছ?
নীলা: (খুশি হয়ে) একটা অটোমেটিক সবজি কাটার মেশিন। হাত দিতে হবে না, আলু-পটল দিলেই কুচি কুচি হয়ে যাবে।
আরিফ: (মাথায় হাত দিয়ে) আমাদের বাসায় গত তিন বছর ধরে একটা ইলেকট্রিক চপার পড়ে আছে, যেটা তুমি আজ পর্যন্ত খোলোনি। রতন, ফেরত দাও এটা!
নীলা: (মুখ হাঁড়ি করে) খবরদার রতন, ফেরত দেবে না। আরিফ, তুমি আসলে একটা কিপটে! মানুষের স্বামীরা বউকে কত কী দেয়, আর আমি একটা সামান্য সবজি কাটার মেশিন কিনলেই দোষ!
(নীলা রাগ করে পার্সেল নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যায়।)
দৃশ্য ২: আরিফের বেডরুম (রাত)
(আরিফ ল্যাপটপে মাসের হিসাব করছে। নীলা মোবাইলে স্ক্রল করছে আর হাসছে।)
আরিফ: নীলা, এ মাসে আমার বেতনের টাকা শেষ। ক্রেডিট কার্ডের বিল এসেছে ৪০ হাজার টাকা। অথচ আজ মাত্র ১৫ তারিখ। বাকি অর্ধেক মাস আমরা চলবো কীভাবে?
নীলা: ওহ আরিফ, তুমি এত চিন্তা করো কেন? আল্লাহ্ রিজিক দাতা। তাছাড়া, আমার বান্ধবীরা সবাই মালদ্বীপ যাচ্ছে। আমরা অন্তত কক্সবাজার তো যেতেই পারি, তাই না?
আরিফ: কক্সবাজার? ক্রেডিট কার্ডের মিনিমাম ডিউ দেওয়ার টাকা নেই আমার কাছে! নীলা, একটু বোঝো। মধ্যবিত্তের সংসার এভাবে চলে না। সঞ্চয় না থাকলে বিপদে পড়লে কেউ এগিয়ে আসবে না।
নীলা: (বিরক্ত হয়ে) রাখো তোমার মধ্যবিত্তের ঘ্যানঘ্যান। আমি ঘুমালাম।
দৃশ্য ৩: রান্নাঘর ও বসার ঘর (দুপুর - এক সপ্তাহ পর)
(বাসায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। ড্রয়ার, আলমারি সব ফাঁকা। আমেনা বেগম রান্নাঘরে চালের ড্রাম উপুড় করে দেখছেন চাল নেই।)
আমেনা বেগম: আরিফ, ঘরে তো চাল-ডাল কিচ্ছু নেই রে বাবা। আজ কী রান্না করবো?
আরিফ: (হতাশ গলায়) মা, আমার পকেটে মাত্র ২০০ টাকা আছে। ক্রেডিট কার্ডও ব্লক হয়ে গেছে অতিরিক্ত খরচের কারণে। বন্ধুদের কাছেও ধার চেয়ে পাইনি।
নীলা: (ড্রয়িংরুমে এসে) আরিফ, আমার অনলাইন থেকে অর্ডার করা এক জোড়া জুতো এসেছে। ১২০০ টাকা দাও তো।
আরিফ: (এবার রেগে চিৎকার করে) টাকা নেই নীলা! কোনো টাকা নেই! ঘরে চাল কেনার টাকা নেই, আর তুমি জুতোর জন্য টাকা চাচ্ছো? এই নাও আমার মানিব্যাগ, দেখো কী আছে এতে!
(আরিফ মানিব্যাগটা ছুড়ে দেয়। সত্যি সত্যিই তাতে মাত্র একটা একশ টাকার নোট আর কিছু কয়েন। নীলা হতভম্ব হয়ে যায়।)
নীলা: সত্যি... সত্যি টাকা নেই? কিন্তু তোমার তো এত টাকা বেতন!
আরিফ: বেতন ৩০ তারিখে হয় নীলা, আর তোমার শপিংয়ের কারণে সেটা ৫ তারিখেই শেষ হয়ে যায়। আজ থেকে এই সংসারে আর কোনো বাড়তি খরচ হবে না। রতন, জুতো ফেরত দিয়ে দাও।
দৃশ্য ৪: একটি আকস্মিক বিপদ (কয়েকদিন পর)
(আমেনা বেগম হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে বসার ঘরের সোফায় ঢলে পড়েন। রতন চিৎকার করে ওঠে।)
রতন: ভাইয়া! ভাবি! জলদি এসো। আম্মা কেমন করছেন!
(আরিফ ও নীলা ছুটে আসে। আমেনা বেগম অসুস্থ।)
আরিফ: (আতঙ্কিত) হার্টের সমস্যা! জলদি হাসপাতালে নিতে হবে। রতন, অ্যাম্বুলেন্স ডাক।
(হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ডাক্তার জানান, আমেনা বেগমকে ভর্তি করতে হবে এবং জরুরি কিছু টেস্টের জন্য এখনই ২০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে।)
হাসপাতালের কাউন্টার: স্যার, আগে ২০ হাজার টাকা ক্যাশ জমা দিন, তারপর ফাইল প্রসেস হবে।
আরিফ: (কেঁদে ফেলে) ভাই, আমার কাছে এই মুহূর্তে কোনো টাকা নেই। আমার ক্রেডিট কার্ডও কাজ করছে না। প্লিজ, আমার মায়ের চিকিৎসা শুরু করুন, আমি দুপুরের মধ্যে টাকা জোগাড় করছি।
কাউন্টার: দুঃখিত স্যার, হাসপাতালের নিয়ম।
(আরিফ দেয়ালে মাথা ঠুকে কাঁদতে থাকে। সে একের পর এক আত্মীয়কে ফোন করছে, কিন্তু কেউ এত দ্রুত টাকা দিতে পারছে না। নীলা এক কোণায় দাঁড়িয়ে দেখছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার দামি দামি শাড়ি, জুতো আর কসমেটিকসের প্যাকেটগুলো। সে বুঝতে পারে, তার এই বেহিসেবি খরচের কারণেই আজ তার শাশুড়ি মৃত্যুর মুখে, অথচ স্বামীর হাতে এক টাকাও নেই।)
দৃশ্য ৫: নীলার উপলব্ধি ও পরিবর্তন
(নীলা দৌড়ে হাসপাতালের বাইরে যায়। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে আসে। তার হাতে ২০ হাজার টাকা। সে কাউন্টারে টাকাটা জমা দেয়।)
আরিফ: (অবাক হয়ে) নীলা! তুমি এত টাকা কোথায় পেলে?
নীলা: (চোখের জল মুছে) আমার বিয়ের সোনার চুড়ি দুটো পাশের জুয়েলারির দোকানে বন্ধক রেখে এসেছি আরিফ।
আরিফ: (স্তব্ধ হয়ে যায়) নীলা... তোমার শখের চুড়ি...
নীলা: (আরিফের হাত ধরে) আমাকে মাফ করে দাও আরিফ। আজ যদি আমার জমানো কিছু টাকা থাকতো, তবে আমার বিয়ের গয়না হাতছাড়া হতো না। আম্মার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী। আমি বুঝতে পেরেছি, সঞ্চয় কতটা জরুরি। শখ পূরণের চেয়ে জীবনের নিরাপত্তা অনেক বড়।
দৃশ্য ৬: বসার ঘর (ছয় মাস পর - সমাপ্তি)
(আমেনা বেগম সুস্থ হয়ে সোফায় বসে আছেন। আরিফ অফিস থেকে ফিরেছে। রতন ড্রয়িংরুমে বসে পড়ছে। নীলা হাতে একটা ডায়েরি নিয়ে হিসাব করছে।)
নীলা: আরিফ, এই নাও এ মাসের খরচের হিসাব। বাজার খরচ, ইউটিলিটি বিল আর আম্মার ওষুধের পর এবার আমাদের ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় হয়েছে।
আরিফ: (হেসে) বাহ্! আমার বেহিসেবি বউ তো এখন পাকা অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়ে গেছে!
রতন: শুধু কি তাই ভাইয়া? ভাবি এখন অনলাইনে ‘মিতব্যয়ী সংসার’ নামে একটা পেজ খুলেছে, যেখানে উনি নারীদের শেখাচ্ছেন কীভাবে টাকা জমাতে হয়!
আমেনা বেগম: (হেসে) আমার বউমা তো ঘরের লক্ষ্মী। বিপদে যে বুদ্ধি খাটায়, সেই তো আসল ঘরণী।
নীলা: (আরিফের দিকে তাকিয়ে) আর কোনো বেহিসেব নয়। কারণ, হিসাবের সংসারেই আসল সুখ।
(সবাই হাসে। স্ক্রিন ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে।)
--- সমাপ্ত ---
No comments:
Post a Comment