নাটক: মেঘের দেশে তুমি
রচনা: কিশোর দুলাল রায়
ধরন: রোমান্টিক / ড্রামা
সময়কাল: ১ ঘণ্টা (টিভি বা ওটিটি স্পেশাল)
চরিত্রসমূহ
- আকাশ (২৮): একজন স্বাধীনচেতা ফটোগ্রাফার এবং ট্রাভেল ব্লগার। একটু চুপচাপ, কিন্তু আবেগ গভীর।
- মেঘলা (২৫): চঞ্চল, হাসিখুশি এবং প্রকৃতিপ্রেমী একজন স্থপতি। পাহাড় আর মেঘ যার ভীষণ প্রিয়।
- রাহাত (৩০): আকাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও গাইড, যে সাজেকে একটি ছোট্ট কটেজ চালায়।
দৃশ্য ১: সাজেকের আঁকাবাঁকা পথ
স্থান: পাহাড়ী পথ / কটেজের বারান্দা
সময়: বিকেল
(পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে আকাশে মেঘ জমছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ি উপত্যকা। আকাশ তার ক্যামেরা হাতে কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের ছবি তুলছে। হঠাৎ কটেজের গেট দিয়ে হাতে প্রকাণ্ড একটা ট্রলি ব্যাগ আর ব্যাকপ্যাক নিয়ে ঢুকলো মেঘলা। ক্লান্ত, কিন্তু তার চোখেমুখে অদ্ভুত এক উত্তেজনা।)
মেঘলা: (একটু হাঁপাতে হাঁপাতে, উঁচুতে তাকিয়ে) এই যে শুনছেন! রাহাত ভাই কি ভেতরে আছেন?
(আকাশ ক্যামেরা নামিয়ে নিচে তাকায়। মেঘলার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর নিজেকে সামলে নেয়।)
আকাশ: রাহাত ভাই তো বাজারে গেছেন। ফিরতে একটু দেরি হবে। আপনি বুকিং করেছিলেন?
মেঘলা: (গালে জমিয়ে রাখা চুল সরিয়ে) হ্যাঁ, আমিই ‘মেঘলা’। তিন নম্বর কটেজটা আমার বুক করা। এত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে গিয়ে তো আমার আধমরা অবস্থা! একটু জল পাওয়া যাবে?
আকাশ: (হাসি চেপে) নিশ্চিত। দাঁড়ান, আসছি।
দৃশ্য ২: কটেজের ক্যাফে / আড্ডা
স্থান: কাঠের তৈরি ছোট্ট ক্যাফেটেরিয়া
সময়: সন্ধ্যা
(বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কাঠের টেবিলে দুটো ধোঁয়া ওঠা বাঁশের কাপে চা। আকাশ ও মেঘলা মুখোমুখি বসে আছে।)
মেঘলা: (চায়ে চুমুক দিয়ে) বাহ্! এই বৃষ্টির মধ্যে গরম চা... সত্যি, স্বর্গের মতো লাগছে! তা, আপনি এখানে কতদিন ধরে আছেন?
আকাশ: এই তো, চার-পাঁচ দিন হবে। আমি মূলত মেঘ আর কুয়াশার টাইম-ল্যাপস শট নিতে এসেছি। আর আপনি? একা একা পাহাড়ে? ভয় করে না?
মেঘলা: (হেসে) ভয় পাওয়ার মতো জীবন তো শহরের ফ্ল্যাট বাড়িতেই কাটিয়ে দিলাম! ইট-কাঠের খাঁচা ছেড়ে মেঘদের কাছাকাছি আসাই তো আমার স্বপ্ন ছিল। জানেন, আমার নাম ‘মেঘলা’, অথচ আমি আগে কখনো পাহাড়ি মেঘকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখিনি!
আকাশ: (ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করতে করতে) সব জিনিস কি ছুঁতে হয়? কিছু জিনিস দূর থেকে দেখতেই বেশি সুন্দর লাগে। ছুঁতে গেলে হয়তো উধাও হয়ে যায়।
মেঘলা: (আকাশের দিকে তাকায়, একটু ভেবে) আপনি বড্ড গম্ভীর লোক তো! জীবনটাকে এত জটিল করে ভাবেন কেন? মেঘ ছুঁলে উধাও হয় না, বরং আপনাকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।
(আকাশ মেঘলার চোখের দিকে তাকায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে নরম একুস্টিক গিটারের সুর বাজে।)
দৃশ্য ৩: কঙ্গলাক পাহাড়ের চূড়া
স্থান: কঙ্গলাক পাহাড়
সময়: ভোরবেলা
(পাহাড়ের চারপাশে সাদা মেঘের সমুদ্র। মেঘলা দু'হাত ছড়িয়ে বাতাসের স্বাদ নিচ্ছে। যেন সে মেঘে ভাসছে। আকাশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছাঁয়া থেকে নিঃশব্দে তার ছবি তুলছে।)
মেঘলা: (পেছনে ফিরে আকাশকে দেখে ফেলে) অাই! চুরি করে ছবি তোলা হচ্ছে?
আকাশ: (একটু ধরা পড়ার ভঙ্গিতে) না... মানে, আলোর ফ্রেমটা খুব সুন্দর ছিল। প্রাকৃতিক শট।
মেঘলা: (আকাশের কাছে এসে ক্যামেরাটা দেখতে চায়) দেখি দেখি! কেমন এলো?
(দুজন খুব কাছাকাছি দাঁড়ায়। ক্যামেরা স্ক্রিনে মেঘলার ছবি—বাতাসে তার চুল উড়ছে, পেছনে সাদা মেঘ। দৃশ্যটি অপরূপ।)
মেঘলা: (মুগ্ধ হয়ে) বা রে! ছবিটা তো সত্যিই দারুণ তুলেছেন! আমাকে পাঠাবেন কিন্তু।
আকাশ: পাঠাবো। তবে একটা শর্তে... আজ সারা দিন পাহাড়ের যেখানে যেখানে যাবেন, আমাকে সাথে রাখতে হবে।
মেঘলা: (কপট রাগ দেখিয়ে) শর্ত? বেশ, রাজি! তবে শর্ত একটাই—আজ পুরো দিন আপনার ওই মেজাজী ক্যামেরা বন্ধ রাখতে হবে। শুধু চোখে দেখে পাহাড় উপভোগ করবেন।
দৃশ্য ৪: সম্পর্কের সমীকরণ
স্থান: কটেজের খোলা উঠান / ক্যাম্পফায়ার
সময়: রাত
(ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বলছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। রাহাত, আকাশ ও মেঘলা গানে আর আড্ডায় মেতে আছে। কটেজের মালিক রাহাত গিটার বাজাচ্ছে।)
রাহাত: তা, তোদের দুজনকে দেখে তো মনেই হচ্ছে না যে কালকে তোদের প্রথম পরিচয় হলো! মনে হচ্ছে কত বছরের চেনা।
(আকাশ ও মেঘলা একে অপরের দিকে তাকায়। মেঘলা লজ্জা পেয়ে আগুন পোহানোর ভান করে।)
মেঘলা: রাহাত ভাই, আপনার বন্ধু কিন্তু খুব ভালো ছবি তোলে। তবে মানুষটা খুব অল্প কথা বলে।
আকাশ: কম কথা বলা ভালো মেঘলা। মানুষ যত বেশি কথা বলে, তত নিজের গোপন দুঃখগুলো বাইরে প্রকাশ করে ফেলে।
মেঘলা: (চুপ হয়ে যায়) দুঃখ লুকানো কি এতই জরুরি, আকাশ? কখনো কখনো তো মেঘও জমে জমে ভারী হয়ে গেলে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। আপনি না হয় একটু ঝরেই পড়লেন?
(আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের ট্রাভেল ডায়েরিটা বের করে মেঘলার হাতে দেয়।)
আকাশ: এই ডায়েরিটা আমার জীবনের। কিন্তু সাজেকে আসার পর থেকে এর পাতাগুলো কেন যেন নতুন এক গল্প লিখতে চাইছে...
দৃশ্য ৫: ঝড় ও অনুভূতির প্রকাশ
স্থান: কটেজের বারান্দা
সময়: পরদিন দুপুর
(পাহাড়ে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় ও প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাসের তোড়ে বারান্দার জিনিসপত্র উড়ে যাচ্ছে। মেঘলা ভয় পেয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে।)
আকাশ: (দৌড়ে এসে মেঘলার হাত ধরে ভেতর নিয়ে আসে) মেঘলা! তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? খুব ঠান্ডা লেগে যাবে তো!
মেঘলা: (ভীতু কণ্ঠে, আকাশে দিকে চেয়ে) আকাশ... এই ঝড়টা খুব ভয়ংকর।
আকাশ: (মেঘলার দু'কাঁধ ধরে সোজা করে দাঁড় করায়) কিছু হয়নি, আমি আছি তো। ভয় পেও না।
(মেঘলা আকাশের চোখে চোখ রাখে। বাইরে ঝড়ের গর্জন, ভেতরে নিঃশব্দ ভালোবাসা।)
মেঘলা: তুমি কালকে বললে না, স্পর্শ করলে জিনিস হারিয়ে যায়? আজ দেখো, মেঘ কিন্তু আমাদের ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তুমি কি আমাকেও হারিয়ে যেতে দেবে?
আকাশ: (আবেগে আপ্লুত হয়ে) কখনো না। আমি মেঘের পেছনের নীল আকাশ হতে চাই মেঘলা, যাতে তোমার ঝড়-বৃষ্টি সব সামলে তোমায় আগলে রাখতে পারি।
(আকাশ মেঘলার কপালে হালকা স্পর্শ করে। বৃষ্টির শব্দে যেন ভালোবাসার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।)
দৃশ্য ৬: শেষ দৃশ্য (বিদায় ও সূচনা)
স্থান: সাজেক বাসস্ট্যান্ড / হেলিপ্যাড
সময়: পরের দিন সকাল
(ভোরের রোদ উঠে গেছে। মেঘলা তার ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শহর তাকে আবার ডেকে পাঠিয়েছে। আকাশ পাশে দাঁড়িয়ে আছে।)
মেঘলা: (একটু বিষণ্ণ হাসিতে) তাহলে আসি? শহর আবার আমাকে গিলে খেতে তৈরি।
আকাশ: শহর তোমাকে হয়তো ডাকছে, কিন্তু মেঘের দেশ কি তোমায় ভুলতে পারবে?
মেঘলা: (পকেট থেকে একটি ছোট্ট বাঁশের তৈরি স্মারক বের করে আকাশের হাতে দেয়) এটা রেখে দাও। আর হ্যাঁ, ডায়েরির শেষ পাতাটা কিন্তু আমি লিখে দিয়ে এসেছি।
আকাশ: (অবাক হয়ে) সত্যি? কী লিখেছ?
মেঘলা: (গাড়িতে উঠে বসে, হেসে) গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে! গিয়ে পড়ে নিয়ো। আবার দেখা হবে, আকাশ!
(গাড়িটি আঁকাবাঁকা পথ ধরে নেমে যেতে থাকে। আকাশ ডায়েরিটা খোলে। শেষ পাতায় লেখা—)
"মেঘ একা একা ভাসতে পারে, কিন্তু তার রূপ ফুটে ওঠে তখনই, যখন সে তার নিজের আকাশের দেখা পায়। মেঘের দেশে তুমি আমার সেই আকাশ..."
(আকাশ হেসে কটেজের দিকে ফিরে তাকায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে থিম মিউজিক বেজে ওঠে—
"নয়ন মেলে তাকাই যখন, দেখি শুধু তোমায়,
তোমার মাঝে নতুন করে হারাই প্রতি সন্ধ্যায়।
তুমি আমার ভোরের আলো, মিষ্টি রোদের হাসি,
কানে কানে বলছি আবার—তোমায় ভালোবাসি।
একলা পথের বাঁকে আমার হাতটি চেপে ধরো,
হৃদয় মাঝে লুকিয়ে রেখে আপন আমায় করো।
তোমার ছোঁয়ায় নিমিষেই দূর স্বপ্নগুলো জাগে,
এমন মায়া, এমন প্রেম তো হয়নি কভু আগে!
তুমি আমার ভোরের আলো, মিষ্টি রোদের হাসি,
কানে কানে বলছি আবার—তোমায় ভালোবাসি।
মেঘের দেশে ভাসবো দুজন ডানা মেলে দূরে,
সুর বাঁধি আজ ভালোবাসার অমলিন এক পুরে।
ঝড় আসুক বা আঁধার নামুক, থাকবো পাশে স্থির,
তুমি আমার শান্ত নদী, তুমি প্রেমের তীর।
চোখের তারায় লেখা আছে গল্প হাজারটা,
তোমার সাথে কাটাতে চাই হাজার জীবনটা।
তুমি আমার মেঘের ছায়া, তুমি শ্রাবণ ধারা,
তোমায় ছাড়া কাটবে না আর জীবন দিশাহারা।
নয়ন মেলে তাকাই যখন, দেখি শুধু তোমায়,
তোমার মাঝে নতুন করে হারাই প্রতি সন্ধ্যায়।
তুমি আমার ভোরের আলো, মিষ্টি রোদের হাসি,
কানে কানে বলছি আবার—তোমায় ভালোবাসি।"
স্ক্রিন ধীরে ধীরে ডার্ক হয়ে নাটক শেষ হয়।)
— সমাপ্ত —

No comments:
Post a Comment