হৃদয়ে হালকা বৃষ্টি
সময়সীমা: ৬০ মিনিট (১ ঘণ্টা)
চরিত্রসমূহ:
১. আকাশ (২৫): কর্পোরেট চাকরিজীবী। গোছানো, একটু গম্ভীর স্বভাবের হলেও মেঘলার পাগলামির ভীষণ ভক্ত।
২. মেঘলা (২২): ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। চটপটে, বাচাল, ইমোশনাল এবং অসম্ভব হাসিখুশি।
৩. শুভ (২৫): আকাশের বন্ধু। সমঝদার এবং দুজনের সম্পর্কের মাঝে অনুঘটক।
৪. ওয়েটার/রিকশাওয়ালা: পার্শ্বচরিত্র।
দৃশ্য ১: ক্যাফেটেরিয়া (সময়: ২০ মিনিট)
(প্রেক্ষাপট: বিকেল বেলা। ক্যাফের এক কোণে আকাশ বসে আছে। টেবিলে ল্যাপটপ খোলা, সে বারবার ঘড়ি দেখছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃদু ক্যাফে মিউজিক। মেঘলা হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল। তার চুল কিছুটা এলোমেলো।)
আকাশ: (ল্যাপটপ বন্ধ করতে করতে, গম্ভীর গলায়) বাহ! অবশেষে ম্যাডামের পায়ের ধুলো পড়ল! ঘড়ির কাঁটাটা কি তোমার চেনা-জানার বাইরে থাকে মেঘলা? বিকেল ৫টায় আসার কথা ছিল, এখন সন্ধ্যা ৬টা ২০! পুরো এক ঘণ্টা বিশ মিনিট লেট!
মেঘলা: (ধপ করে চেয়ারটায় বসে, ব্যাগটা টেবিলে রেখে হাফ ছাড়ল) উফ আকাশ! তুমি একটা আস্ত রোবট। তুমি দেখছ আমি ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট লেট করেছি। আর আমি ভাবছি, এই ব্যস্ত শহরে একটা ছেলে আমার জন্য ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট ধরে একাসনে বসে অপেক্ষা করছে! ভাবলেই হৃদয়ে কেমন হালকা বৃষ্টি নেমে যাচ্ছে! কী গভীর প্রেম!
আকাশ: (হাঁ করে তাকিয়ে) বাহ! চোরের মায়ের বড় গলা! এই ডায়লগ দিয়ে আর কতদিন চালাবে? তা এতক্ষণ কী করছিলে শুনি? আবার কোনো বিড়াল ছানাকে রাস্তা পার করাচ্ছিলে? নাকি ট্রাফিক জ্যাম?
মেঘলা: (একটু হেসে, চুলগুলো কানের পিছে গুজে) উঁহু, আজ জ্যামের দোহাই দেব না। সত্যি বলব? আসার সময় না... নিউ মার্কেটের মোড়ে একটা শাড়ি দেখছিলাম। হালকা নীল রঙের, জমিনটা ঠিক তোমার এই আকাশের মতো। ভাবছিলাম শাড়িটা পরে যখন তোমার সামনে আসব, তুমি নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করবে! ওটা দেখতে গিয়েই...
আকাশ: (মনে মনে খুশি হলেও মুখে রাগ দেখিয়ে) শাড়ি দেখতে গিয়ে এত দেরি? তা কিনেছ?
মেঘলা: (কাছে ঝুঁকে, ফিসফিস করে) না তো! পকেটে তো গড়ের মাঠ। ভাবলাম, রাগ ভাঙানোর জন্য আগে তোমাকে দেখাই, তারপর তোমার পকেট থেকেই... (মিষ্টি করে হাসল)।
আকাশ: (মাথা নেড়ে) বুঝেছি, আমার পকেটে আজ সত্যিই হালকা বৃষ্টি নয়, একেবারে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাবে!
(ওয়েটারকে ডেকে) ওয়েটার, একটা কোল্ড কফি, একটা ব্ল্যাক কফি আর দুটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিন তো জলদি।
মেঘলা: (অবাক হয়ে) তুমি ব্ল্যাক কফি খাবে কেন? তুমি তো তেতো জিনিস সহ্যই করতে পারো না!
আকাশ: কেন পারব না? তোমার এই যে রোজকার তেতো তেতো কথা আর লেট করার বাহানা যদি আমি বছরের পর বছর সহ্য করতে পারি, তবে ব্ল্যাক কফি তো সামান্য জলভাত!
মেঘলা: (মুখ বাঁকিয়ে) ও আচ্ছা! এতই যখন তেতো লাগে, তবে ঝাল-মিষ্টি কোনো মেয়ের কাছে গেলেই পারো। কে বারণ করেছে?
আকাশ: (একটু নরম সুরে, মেঘলার দিকে তাকিয়ে) চেষ্টা করেছিলাম তো। কিন্তু সমস্যা হলো, অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকালেই এই মেঘলা আকাশটার কথা মনে পড়ে যায়। আর তখন মনে হয়, ঝাল-মিষ্টির চেয়ে এই মেঘ-বৃষ্টির অত্যাচারটাই অনেক বেশি সুন্দর।
মেঘলা: (লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল, টেবিলের ওপর রাখা আকাশের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল) আচ্ছা খড়কুটো মশাই, রাগ কমেছে?
আকাশ: কফিটা আসুক, তারপর ভাবব। তবে একটা শর্ত আছে। বিলটা কিন্তু আজ তুমি দেবে!
মেঘলা: (চোখ কপালে তুলে) ওরে বাবা! প্রেমিকের এই কিপটে রূপ তো জানা ছিল না! ঠিক আছে, বিল আমিই দেব। কিন্তু আমার ব্যাগে তো শুধু ৫০০ টাকার একটা নোট আছে, বাকিটা তোমার পকেট থেকেই 'উধার' নেব!
(দুজনেই হেসে ওঠে। কফি আসে। তারা গল্প করতে করতে কফি খায়। আলো ধীরে ধীরে কমে আসে।)
দৃশ্য ২: রিকশায় খুনসুটি (সময়: ১৫ মিনিট)
(প্রেক্ষাপট: রাস্তা। সন্ধ্যা নেমেছে, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলছে। আকাশ আর মেঘলা একটা রিকশায় বসে আছে। রিকশা চলছে হুড ফেলা অবস্থায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা ট্রাফিকের শব্দ আর রোমান্টিক আবহ সঙ্গীত।)
মেঘলা: (আকাশের কাঁধে মাথা রেখে) আকাশ, আচ্ছা আমাদের যখন বিয়ে হবে, আমরা রোজ সন্ধ্যায় এভাবে রিকশায় ঘুরব তো?
আকাশ: (হেসে) রোজ সন্ধ্যায় ঘুরলে তো অফিস থেকে আমাকে বের করে দেবে। তখন রিকশার ভাড়ার টাকা কে দেবে? তুমি টিউশনি করে চালাবে?
মেঘলা: (আকাশের চিমটি কেটে) তুমি একটা আস্ত আন-রোমান্টিক মানুষ! এই সুন্দর মুহূর্তে কেউ চাকরির কথা বলে? আমি এত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছি, আর তুমি সেটাকে লাথি মেরে ভেঙে দিলে!
আকাশ: আচ্ছা বাবা ভুল হয়েছে। রোমান্টিক স্বপ্ন দেখো। তা রিকশায় ঘোরার পর আর কী করবে তোমার স্বপ্নে?
মেঘলা: তারপর আমরা একটা ছোট বাড়ি ভাড়া করব। বারান্দায় থাকবে অনেকগুলো মানিপ্ল্যান্ট আর গোলাপ গাছ। প্রতিদিন সকালে তুমি যখন ঘুমে থাকবে, আমি গাছের পাতা থেকে জল নিয়ে তোমার মুখে ছিটিয়ে দেব!
আকাশ: (ভয় পাওয়ার ভংগি করে) ওরে বাবা! ওটা সকালের রোমান্স হবে না, ওটা হবে থ্রিলার সিনেমা! এমনিতেই সকালে আমার ঘুম ভাঙতে চায় না, তার ওপর ঠান্ডা জল!
মেঘলা: (অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে) হুহ! তোমার সাথে কথাই বলব না। রিকশাওয়ালা মামা, রিকশা থামান, আমি নেমে যাব।
রিকশাওয়ালা: (পেছনে তাকিয়ে হেসে) আপা, নামবেন না। স্যারে তো আপনেরে ভালোবাসেই এইরকম ঠাট্টা করতাছে। আমাগো মামীও বিয়ার আগে এইরকম রাগ করত!
আকাশ: (হেসে ফেলে রিকশাওয়ালাকে) দেখছেন মামা? আপনার মামীও এমন এক ঘণ্টা লেট করত?
রিকশাওয়ালা: ওরে স্যার! হেয় তো আইতই না! তিন ঘণ্টা খাড় করায়া রাখত।
মেঘলা: (হেসে ফেলে আকাশের হাত জড়িয়ে ধরে) দেখেছ? আমি তো মাত্র এক ঘণ্টা বিশ মিনিট লেট করেছি। সেই তুলনায় আমি কত ভালো! এখন বলো, আমাকে একটা আইসক্রিম খাওয়াবে কি না?
আকাশ: (পকেটে হাত দিয়ে) মানিব্যাগের অবস্থা তো এমনিতেই করুণ, তার ওপর আবার আইসক্রিম! আচ্ছা চলো, আজ পকেট পুরো খালিই হোক।
দৃশ্য ৩: বন্ধুর এন্ট্রি ও ভুল বোঝাবুঝি (সময়: ১৫ মিনিট)
(প্রেক্ষাপট: একটি পার্ক বা রাস্তার ধারের ফুচকার দোকান। সেখানে আকাশের বন্ধু শুভর সাথে দেখা হয়। শুভ একটু রসিক টাইপের ছেলে।)
শুভ: (আকাশকে দেখে) আরে আকাশ! কী খবর? আর পাশে এটি কে? আমাদের ভাবী সাহেব নাকি?
আকাশ: (হেসে) হ্যাঁ রে। এই হলো মেঘলা। আর মেঘলা, এ হলো শুভ—আমার কলেজের বন্ধু আর পৃথিবীর এক নম্বর আড্ডাখোর।
মেঘলা: (নমস্কার/সালাম জানিয়ে) ভালো আছেন ভাইয়া? আকাশ আপনার কথা অনেক বলেছে।
শুভ: ভালো আছি ভাবী। তবে আকাশ নিশ্চয়ই আমার বদনাম করেছে? ও তো নিজেই একটা কিপটে। আচ্ছা ভাবী, ও কি আপনাকে এখনো সেই কলেজের পুরোনো ডায়লগটাই মারে? ওই যে—'তুমি আমার জীবনের প্রথম বৃষ্টি'?
মেঘলা: (কান খাড়া করে, আকাশের দিকে তাকিয়ে) মানে? কোন ডায়লগ? ও কি অন্য কাউকেও এই ডায়লগ দিত নাকি?
শুভ: (পরিস্থিতি গরম করার জন্য মজা করে) আরে ভাবী, আপনি জানেন না? কলেজে থাকতে ও এক মেয়েকে...
আকাশ: (শুভর মুখ চেপে ধরে) এই শুভ! একদম চুপ কর। ও সব কিছু না মেঘলা, ও বানিয়ে বলছে।
মেঘলা: (হাত সরিয়ে নিয়ে, গম্ভীর হয়ে) না আকাশ, শুদুধু ও কেন বলবে? শুভ ভাইয়া বলুন না, কে ছিল সে?
শুভ: (বুঝতে পেরে যে এবার রিয়াল ঝগড়া লেগে যাবে) আরে না ভাবী, আমি মজা করছিলাম। আকাশ তো কলেজে মেয়েদের দেখলেই পালাত। ও তো আস্ত একটা দেবদাস ছিল আপনার জন্য! আমি জাস্ট ওর একটু পা টানছিলাম।
মেঘলা: (অভিমানী গলায়) না, আমার আর ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে না। আকাশ, আমি বাড়ি যাব।
আকাশ: (শুভকে চোখ রাঙিয়ে) তোর জন্য আজ আমার কপালে শনি আছে! (মেঘলার দিকে তাকিয়ে) মেঘলা, শোনো... ও জাস্ট ইয়ার্কি করছিল।
মেঘলা: (হনহন করে হাঁটতে শুরু করে) কোনো কথা শুনব না। তোমরা ছেলেরা সব এক!
দৃশ্য ৪: ক্লাইম্যাক্স ও হৃদয়ে হালকা বৃষ্টি (সময়: ১০ মিনিট)
(প্রেক্ষাপট: মেঘলাদের বাড়ির গলি। আলো আঁধারি পরিবেশ। হঠাৎ করেই টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মেঘলা ছাতা ছাড়া হাঁটছে, পেছন পেছন আকাশ আসছে।)
আকাশ: (ছুটে এসে মেঘলার হাত ধরে) মেঘলা! দাঁড়াও। এভাবে না বুঝে রাগ করে চলে যাচ্ছ কেন? শুভ সত্যি ইয়ার্কি করছিল। আমার জীবনে তুমিই প্রথম, আর তুমিই শেষ। বিশ্বাস করো।
মেঘলা: (চোখে জল, বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যাচ্ছে) তুমি সবসময় আমার লেট করা নিয়ে রাগ দেখাও, আমি কিছু বলি? কিন্তু তুমি অন্য কারো সাথে আমাকে তুলনা করবে, ওটা আমি সহ্য করতে পারি না।
আকাশ: (মেঘলার দুই কাঁধ ধরে, খুব নরম গলায়) পাগলী একটা! এই আকাশে কি কখনো দুটো মেঘ একসাথে জমে? এই আকাশে তো শুধু একটাই মেঘলা আছে, যে সারাদিন শুধু বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। শুভ জাস্ট আমাদের একটু রাগাতে চেয়েছিল। আই অ্যাম স্যরি, বাবা। আর কখনো এমন মজা করতে দেব না কাউকে।
মেঘলা: (আকাশের বুকে আলতো করে কিল মেরে) তুমি বড্ড দুষ্টু! আর তোমার ওই বন্ধুটা আরও বেশি খ্যাপাটে। আমার সত্যি খুব ভয় পেয়েছিল, জানো?
আকাশ: (মেঘলার কপাল থেকে ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে) ভয়ের কিছু নেই। এই যে বৃষ্টি দেখছ? এই বৃষ্টিই আমাদের সাক্ষী।
মেঘলা: (হেসে ফেলে, বৃষ্টির দিকে হাত বাড়িয়ে) সত্যি আকাশ! রাগটা কমে যেতেই মনের ভেতরে কেমন যেন শান্তি লাগছে। একদম নাটকের নামের মতো... হৃদয়ে হালকা বৃষ্টি!
আকাশ: (পকেট থেকে সেই হালকা নীল শাড়িটা বের করে, যেটা সে মেঘলার অজান্তেই ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় কিনে নিয়েছিল) এই নাও। তোমার সেই 'আকাশ' রঙের শাড়ি।
মেঘলা: (অবাক হয়ে, খুশিতে চিৎকার করে) ওমা! এটা তুমি কখন কিনলে? তুমি তো ক্যাফেতে বসে বলছিলে পকেটে গড়ের মাঠ!
আকাশ: (হেসে) প্রেমিকার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এই আকাশ নিজের পকেট কেন, পুরো দুনিয়া খালি করে দিতে পারে। এবার জলদি বাড়ি যাও, নাহলে ঠান্ডা লেগে যাবে। কাল কিন্তু এই শাড়িটা পরেই আমার সামনে আসবে, মনে থাকে যেন!
মেঘলা: (শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরে, মিষ্টি হেসে) উম্ম... আচ্ছা, কাল ঠিক বিকেল ৫টায়। এক মিনিটও লেট করব না, প্রমিস!
আকাশ: (হেসে) দেখা যাবে!
(মেঘলা হাসতে হাসতে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। আকাশ বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মিষ্টি রোমান্টিক গান বেজে ওঠে এবং আলো আস্তে আস্তে নিভে আসে।)
-সমাপ্ত-

No comments:
Post a Comment