Thursday, 27 August 2026

নাটকঃ যৌতুক _রচনাঃ কিশোর দুলাল রায়

নাটকের নাম: যৌতুক

চরিত্র:
​রহিম (৫০): গ্রামের মধ্যবিত্ত কৃষক, কনে রিপার বাবা।
​আবুল সাহেব (৫৫): বর পক্ষের প্রধান, জহিরের বাবা (লোভী ও অহংকারী)।
​জহির (২৮): পাত্র, সরকারি অফিসের কর্মচারী (ন্যায্যপরায়ণ)।
​রিপা (২২): কনে, রহিম সাহেবের শিক্ষিত ও আত্মমর্যাদাশীল মেয়ে।
রতন (২৭) রিপার বড় ভাই

​দৃশ্য ১
বিয়ের আলোচনার প্রাথমিক ধাপ
​(দৃশ্যপট: রহিম সাহেবের বাড়ির উঠান। গাছে ছায়া ঘেরা পরিবেশ। কাঠের একটি টেবিলে চা, মুড়ি ও মিষ্টি সাজানো। আবুল সাহেব ও রহিম মুখোমুখি বসে আছেন।)

​রহিম: (বিনীতভাবে মিষ্টির প্লেট এগিয়ে দিয়ে) আবুল সাহেব, সামান্য এই গ্রামের খাবার, মুখে তুলে নিন। আপনার মতো বড় মানি মানুষ আমার এই গরিবের ভিটায় পা রেখেছেন, এটাই আমার ভাগ্য।

​আবুল সাহেব: (মিষ্টির দিকে তাচ্ছিল্যের সাথে তাকিয়ে) হুম, আতিথেয়তা ভালোই। তবে রহিম ভাই, মিষ্টির চেয়ে কাজের কথা মিষ্টি হওয়া বেশি দরকার। ছেলে আমার সরকারি চাকরি করে, বোঝেনই তো! বিয়ের বাজার এখন ভীষণ কড়া।

​রহিম: (বুকের ভেতরে ভয় চেপে) তা তো বুঝি ভাই। জহির মাশাল্লাহ খুব লক্ষ্মী ছেলে। আমি আমার সাধ্যমতো মেয়েকে সাজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।

​আবুল সাহেব: (চায়ে চুমুক দিয়ে, গলা ঝেড়ে) সাধ্যের কথা বাদ দিন। একটা হিসাব সোজা হিসাব। আমার ছেলের বন্ধুদের সবার বিয়েতে লাখ লাখ টাকা উপহার এসেছে। আমার ছেলের জন্য আপনার কাছে বেশি কিছু চাইছি না—মাত্র পাঁচ লাখ টাকা নগদ, একটা জাপানি মোটরসাইকেল আর রিপার জন্য ১০ ভরি সোনা।

​রহিম: (চমকে উঠে, হাত দুটি কেঁপে ওঠে) এ... এ আপনি কী বলছেন আবুল সাহেব! পাঁচ লাখ টাকা আর ১০ ভরি সোনা? আমার তো এই তিন বিঘা জমি ছাড়া আর কিছুই নেই। এই টাকা জোগাড় করতে গেলে আমাকে ভিটেমাটি বেচতে হবে!

​আবুল সাহেব: (বিরক্ত হয়ে) ভিটেমাটি বেচবেন নাকি জমি বন্ধক দেবেন, সেটা তো আপনার ব্যাপার! আমার ছেলে তো আর ফেলনা নয়। বাজারে ওর চাহিদা কত জানেন? মেয়ে তো আপনার রাজকন্যা না যে বিনামূল্যে নিয়ে নেব!

​দৃশ্য ২
রিপার প্রবেশ ও যুক্তিতর্ক
​(ভেতর থেকে রিপা ট্রে-তে করে নতুন চা নিয়ে প্রবেশ করে। তার চোখে মুখে আত্মপ্রত্যয়।)

​রিপা: (ট্রে-টি টেবিলে রেখে ঠান্ডা গলায়) বাবা, তুমি অত কাকুতি-মিনতি করছ কেন?

(রিপার ভাই রতন এসে রিপার পাশে দাড়াবে এবং রিপার কাধে হাত রাখবে,রিপা একবার রতনের মুখের দিকে তাকাবে।)

​আবুল সাহেব: (ভ্রূ কুঁচকে) এ আবার কে? বেয়াদবের মতো বড়দের কথার মাঝে কথা বলছে!

​রিপা: (সোজা আবুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে) আমি রহিম সাহেবের মেয়ে রিপা। যার বিয়ের দরদাম করছেন আপনারা। চাচাজান, আপনি আমার বাবার মেহমান, তাই সম্মান দিয়ে বলছি—আমার বাবা আপনাকে ভিটেমাটি বেচে টাকা দিতে যাবে কেন?

​আবুল সাহেব: (রেগে গিয়ে) দেখেছ রহিম ভাই? তোমার মেয়ের মুখের বিষ! পড়াশোনা শিখিয়ে মেয়েকে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শিখিয়েছ! আরে মেয়ে মানুষ, এত তেজ কিসের?

​রহিম: (ভীত হয়ে) মা রিপা, তুই ভেতরে যা! বড়রা কথা বলছি, তুই বুঝবি না।

​রিপা: না বাবা, আমি সব বুঝতে পারছি। চাচাজান আমার যোগ্যতার বিচার করছেন না, বিচার করছেন আমার বাবার পকেটের জোরের। চাচাজান, আমি মাস্টার্স পাস করেছি, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। আপনার ছেলে চাকরি করে বলে কি তাকে হাটে বিক্রি করতে এনেছেন?

​আবুল সাহেব: (টেবিলে চাপড়ে) মুখ সামলে কথা বলো মেয়ে! সরকারি চাকুরের সম্মান রক্ষা করতে যৌতুক লাগে। এটা যৌতুক নয়, এটা আমাদের সামাজিক দাবি!

রতন: শুনেন চাচা আমরাও আমাদের বোনকে কম টাকা-পয়সা খরচ করে মানুষ করি নাই।অনেক পরিশ্রম করেই মানুষ করেছি।

​দৃশ্য ৩
জহিরের আগমন ও মূল সংঘাত
​(বাইরে থেকে মোটরসাইকেলের শব্দ হয়। জাহির ভেতরে প্রবেশ করে। সে পরিস্থিতি দেখে থমকে দাঁড়ায়।)

​জহির: কী হয়েছে বাবা? এত চিৎকার-চেঁচামেচি কিসের? রহিম চাচা, আপনি এভাবে কেঁদে ফেলছেন কেন?

​আবুল সাহেব: (জহিরকে দেখে আস্কারা পেয়ে) আয় জহির, দেখ তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কান্ড! এরা তোকে সামান্য একটা বাইক আর কিছু টাকা দিতে অস্বীকার করছে। আবার তোর মুখের ওপর তোর হবু বউ বেয়াদবি করছে!

রতন: দেখো ভাই বিয়ে হচ্ছে একটি সামাজিক বন্ধন।বিয়ে মানে এই না,যে একটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দেওয়া।

জহির: মানে কি বুঝলাম না।

রতন: আমি বলতে চাইছি বিয়ে হচ্ছে, দুটি পরিবারের মধ্যে একটা বন্ধন আর এখানে চাচা যৌতুক দাবি করছে পাঁচ লক্ষ টাকা,দশ ভরি স্বর্ন আর একটা বাইক।

​জহির: (অবাক হয়ে) বাইক? টাকা? স্বর্ণ? বাবা, এসব কী বলছ তুমি? আমাদের তো শুধু বিয়ের পাকা কথা বলতে আসার কথা ছিল!

​রহিম: (জহিরের হাত ধরে) বাবা জাহির, তুমিই বলো—এই গরিব চাষি পাঁচ লাখ টাকা আর ১০ ভরি সোনা কোথা থেকে দেবে? আমার মেয়েটাকে আমি রক্ত পানি করে পড়াশোনা করিয়েছি, সেটাই কি আমার অপরাধ?

​জহির: (বাবার দিকে ফেরে, কন্ঠে তীব্র অসন্তোষ) বাবা! তুমি আমার অজান্তে এই কাজ করছিলে? তুমি রহিম চাচার কাছে যৌতুক চাইছিলে?

​আবুল সাহেব: (গর্বের সাথে) যৌতুক কেন হতে যাবে? ওটা তো উপহার! তোকে বড় করেছি, পড়াশোনা করিয়েছি, এত বড় চাকরি পাইয়ে দিয়েছি—এখন তার উসুল নেব না?

​জহির: (লজ্জায় মাথা নিচু করে) ছিঃ বাবা! ছিঃ! শিক্ষার আলো পেয়ে যদি আমি নিজেকে বাজারে বিকিয়ে দিই, তবে সেই শিক্ষার দাম কী? তুমি নিজেকে বড় মানুষ দাবি করো, আর আজ একজন মেহনতি বাবার সামনে হাত পেতে ভিক্ষা চাইছ?

​দৃশ্য ৪
চরম সিদ্ধান্ত ও পরিণতি
​আবুল সাহেব: (চরম অপমানিত বোধ করে) মুখ সামলে কথা বল জাহির! বাবার মুখের উপর কথা বলছিস তুই? এই মেয়ের ওপর এমন কী জাদু হলো যে নিজের জন্মদাতা পিতাকে অপমান করছিস? এই বিয়ে হবে না! চল এখান থেকে!

​জহির: (দৃঢ়তার সাথে) তুমি যেতে পারো বাবা। কিন্তু আমি এই অন্যায়ের অংশীদার হব না।

​রিপা: (জহিরের দিকে তাকিয়ে) জহির সাহেব, আপনি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আপনার বাবা যদি এই মনভাব বজায় রাখেন, তবে এই পরিবারে কোনো মেয়ে সুখে থাকতে পারবে না।

​জহির: (রিপার দিকে তাকিয়ে) রিপা, আমি আমার বাবার এই আচরণের জন্য ক্ষমা চাইছি। (রহিমের দিকে ঘুরে) রহিম চাচা, আমি কোনো রাজপুত্র নই, আর আপনার মেয়েও কোনো সামান্য উপহার নয়। সে একজন শিক্ষিত, আত্মমর্যাদাপূর্ণ নারী। আমি কোনো যৌতুক বা উপহারের বিনিময়ে নয়, সম্পূর্ণ নিজের উপার্জনে আপনার মেয়েকে সম্মান দিয়ে ঘরে তুলতে চাই।

​আবুল সাহেব: (হতভম্ব হয়ে) জহির! তুই আমার কথা অমান্য করছিস? তুই এই ভিখারির মেয়েকে বিয়ে করবি?

​জহির: (বাবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে) ভিখারি উনি নন বাবা, ভিখারি আমরা—যারা অন্যের রক্ত পানি করা টাকায় নিজেদের পকেট ভরাতে চাই! আপনি যদি আপনার ভুল বুঝতে পারেন, তবেই আমি আপনাকে নিয়ে বিয়ে করতে আসব। আর নাহলে আমি একা এসে, আপনার আদর্শের বাইরে গিয়ে এই সত্যকে জয় করব।

​(আবুল সাহেব রাগে গজগজ করতে করতে স্থান ত্যাগ করেন। উঠানে নীরবতা নেমে আসে।)

​রহিম: (জহিরের কাঁধে হাত রেখে, চোখে জল) বাবা, তুমি আজ আমাকে আর আমার মেয়েকে যে সম্মান দিলে, তা কোনো টাকায় কেনা যায় না।

​জহির: (হেসে) চাচা, সমাজ বদলাতে হলে আগে নিজেদের ঘর থেকেই শুরু করতে হয়। যৌতুক দেওয়া আর নেওয়া—দুটোই পাপ। আমরা এই পাপ মুক্ত হয়েই নতুন পথ চলব।

​(সবাই নীরব হয়ে দাঁড়ায়। আবহ সঙ্গীতে একটি আশাব্যঞ্জক সুর বাজে।)

​(দৃশ্য সমাপ্ত)

No comments:

Post a Comment