Sunday, 2 August 2026

সংক্ষিপ্ত নাটকঃ হিসাবে গোলমাল_লেখকঃ কিশোর দুলাল রায়

হিসাবের গোলমাল

চরিত্র:

১. আরিফ (২৫): একটু গম্ভীর, বাস্তববাদী এবং সবকিছুর নিখুঁত হিসাব রাখতে পছন্দ করে।

২. সাজিদ (২৫): একটু অলস, খামখেয়ালী আর কথায় কথায় ইমোশনাল হয়ে যাওয়া ছেলে।

দৃশ্য ১: ফ্ল্যাটের ড্রয়িং রুম (রাত ৮টা)

(রুমে চিপসের প্যাকেট ও চায়ের কাপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আরিফ একটা ডায়েরি আর ক্যালকুলেটর নিয়ে সোফায় বসে আছে। সাজিদ মোবাইলে গেম খেলছে।)

আরিফ: (ক্যালকুলেটরে জোর জোরে চাপ দিতে দিতে) সাজিদ, মোবাইলটা রাখ। একটু এদিকে আয়। এক চরম বিপদে পড়েছি।

সাজিদ: (চোখ মোবাইলেই রেখে) পাবজির এই ম্যাচটা শেষ করতে দে ভাই, জোনে আছি। তুই আর তোর বিপদ! রোজই তো কোনো না কোনো ঝামেলা লাগাস।

আরিফ: (বিরক্ত হয়ে সাজিদের হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নেয়) আরে রাখ তোর জোন! এখানে আমার লাইফের বাজেট জোন আউট হয়ে যাচ্ছে। এই মাসের মেস খরচের হিসাবে একটা বিরাট বড় গরমিল বের হয়েছে।

সাজিদ: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিয়ে) কত টাকার গরমিল? হাজার পাঁচেক? নাকি বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে?

আরিফ: (গুরু গম্ভীর গলায়) না। এক টাকার গরমিল!

সাজিদ: (হা করে তাকিয়ে থাকে, তারপর হাসতে হাসতে বিছানায় গড়িয়ে পড়ে) কী? এক টাকা? তুই এক টাকার জন্য আমার লাইভ গেমটা নষ্ট করলি? আরিফ, তুই মানুষ না রে, তুই একটা আস্ত ক্যালকুলেটর!

আরিফ: (খুবই সিরিয়াস) হাসিস না সাজিদ! হিসাবের সৌন্দর্য হচ্ছে তার নিখুঁত হওয়াতে। এক টাকা হোক আর এক লাখ টাকা হোক, হিসাব মিলতেই হবে। তুই কাল রাতে যে ডিম এনেছিলি, ওটার দাম কত ছিল?

সাজিদ: (ভাবুক মুখে) ডিম? বারো টাকা করে চারটা... ৪৮ টাকা। কেন?

আরিফ: কিন্তু তুই ডায়েরিতে লিখেছিস ৪৯ টাকা! এই এক টাকা তুই কোথায় ওড়ালি? কার পেছনে খরচ করলি? আমাকে বল!

দৃশ্য ২: ড্রামা ও ইমোশনের এন্ট্রি

সাজিদ: (হঠাৎ মুখটা গম্ভীর করে ফেলে, চোখে কান্নার অভিনয়) তুই... তুই আমার সততা নিয়ে প্রশ্ন তুললি আরিফ? এই পাঁচ বছরের বন্ধুত্বে আজ তুই একটা টাকার জন্য আমাকে চোর বানিয়ে দিলি?

আরিফ: (ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে) আরে, আমি তোকে চোর বলিনি। আমি জাস্ট হিসাবটা মেলাতে চাচ্ছি...

সাজিদ: (সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে) না আরিফ, তুই আজ আমার আত্মসম্মানে আঘাত করেছিস! মনে আছে, তিন বছর আগে যখন তোর পকেটে একটা টাকা ছিল না, আমি তোকে আমার শেষ পরোটাটা ভাগ করে খাইয়েছিলাম? আজ সেই আমি এক টাকা মেরে দেব? ঈশ্বর! এই দিন দেখার আগে আমার স্ট্রোক কেন হলো না!

আরিফ: (কপালে হাত দিয়ে) ভাই, তুই পরোটার কথা তুলিস না। ওই পরোটার টাকাটাও আমিই দিয়েছিলাম, তুই শুধু অর্ধেকটা ছিনতাই করে খেয়েছিলি। তুই আসল কথায় আয়, এক টাকা বেশি কেন লিখেছিস?

সাজিদ: (একটু আমতা আমতা করে) আচ্ছা... মনে পড়েছে। ওই দোকানদার যখন ডিম দিচ্ছিল, তখন প্লাস্টিকের ব্যাগের জন্য এক টাকা বেশি নিয়েছিল।

আরিফ: (বিজয়ীর হাসি হেসে) এই তো! পেয়ে গেছি! প্লাস্টিক ব্যাগ—১ টাকা। হিসাব মিলে গেছে!

দৃশ্য ৩: টুইস্ট (কমেডি ক্লাইম্যাক্স)

সাজিদ: (পকেট থেকে একটা এক টাকার কয়েন বের করে আরিফের দিকে ছুড়ে দেয়) এই নে তোর এক টাকা! মুক্ত কর আমাকে এই হিসাবের কারাগার থেকে! আজ থেকে আমাদের বন্ধুত্ব শেষ!

আরিফ: (কয়েনটা লুফে নিয়ে ডায়েরিতে এন্ট্রি করে) থ্যাঙ্ক ইউ। হিসাব এখন একদম পারফেক্ট।

(এমন সময় সাজিদের ফোনে একটা মেসেজ আসে। সাজিদ ফোনটা দেখে চমকে ওঠে।)

সাজিদ: (আমতা আমতা করে) আচ্ছা আরিফ... একটা কথা ছিল।

আরিফ: কী?

সাজিদ: ওটা আসলে এক টাকার কয়েন ছিল না। ওটা একটা পাঁচ টাকার কয়েন ছিল, যেটা ভুল করে তোর দিকে চলে গেছে। তুই কি আমাকে চার টাকা ফেরত দিবি? নাকি ওটা আগামী মাসের বাজেটে অ্যাড করবি?

আরিফ: (ক্যালকুলেটরটা আবার হাতে নিয়ে, হিংস্র চোখে সাজিদের দিকে তাকায়) সাজিদ... তুই আজ আর এই রুম থেকে জ্যান্ত বের হতে পারবি না!

(আরিফ সোফার বালিশ তুলে সাজিদকে মারতে যায়, সাজিদ হাসতে হাসতে রুমের চারদিকে দৌড়াতে থাকে।)

— সমাপ্ত —

মেঘের দেশে তুমি

নাটক: মেঘের দেশে তুমি

রচনা: কিশোর দুলাল রায় 

ধরন: রোমান্টিক / ড্রামা

সময়কাল: ১ ঘণ্টা (টিভি বা ওটিটি স্পেশাল)

চরিত্রসমূহ

  • আকাশ (২৮): একজন স্বাধীনচেতা ফটোগ্রাফার এবং ট্রাভেল ব্লগার। একটু চুপচাপ, কিন্তু আবেগ গভীর।
  • মেঘলা (২৫): চঞ্চল, হাসিখুশি এবং প্রকৃতিপ্রেমী একজন স্থপতি। পাহাড় আর মেঘ যার ভীষণ প্রিয়।
  • রাহাত (৩০): আকাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও গাইড, যে সাজেকে একটি ছোট্ট কটেজ চালায়।

দৃশ্য ১: সাজেকের আঁকাবাঁকা পথ

স্থান: পাহাড়ী পথ / কটেজের বারান্দা

সময়: বিকেল

(পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে আকাশে মেঘ জমছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ি উপত্যকা। আকাশ তার ক্যামেরা হাতে কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের ছবি তুলছে। হঠাৎ কটেজের গেট দিয়ে হাতে প্রকাণ্ড একটা ট্রলি ব্যাগ আর ব্যাকপ্যাক নিয়ে ঢুকলো মেঘলা। ক্লান্ত, কিন্তু তার চোখেমুখে অদ্ভুত এক উত্তেজনা।)

মেঘলা: (একটু হাঁপাতে হাঁপাতে, উঁচুতে তাকিয়ে) এই যে শুনছেন! রাহাত ভাই কি ভেতরে আছেন?

(আকাশ ক্যামেরা নামিয়ে নিচে তাকায়। মেঘলার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর নিজেকে সামলে নেয়।)

আকাশ: রাহাত ভাই তো বাজারে গেছেন। ফিরতে একটু দেরি হবে। আপনি বুকিং করেছিলেন?

মেঘলা: (গালে জমিয়ে রাখা চুল সরিয়ে) হ্যাঁ, আমিই ‘মেঘলা’। তিন নম্বর কটেজটা আমার বুক করা। এত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে গিয়ে তো আমার আধমরা অবস্থা! একটু জল পাওয়া যাবে?

আকাশ: (হাসি চেপে) নিশ্চিত। দাঁড়ান, আসছি।

দৃশ্য ২: কটেজের ক্যাফে / আড্ডা

স্থান: কাঠের তৈরি ছোট্ট ক্যাফেটেরিয়া

সময়: সন্ধ্যা

(বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কাঠের টেবিলে দুটো ধোঁয়া ওঠা বাঁশের কাপে চা। আকাশ ও মেঘলা মুখোমুখি বসে আছে।)

মেঘলা: (চায়ে চুমুক দিয়ে) বাহ্! এই বৃষ্টির মধ্যে গরম চা... সত্যি, স্বর্গের মতো লাগছে! তা, আপনি এখানে কতদিন ধরে আছেন?

আকাশ: এই তো, চার-পাঁচ দিন হবে। আমি মূলত মেঘ আর কুয়াশার টাইম-ল্যাপস শট নিতে এসেছি। আর আপনি? একা একা পাহাড়ে? ভয় করে না?

মেঘলা: (হেসে) ভয় পাওয়ার মতো জীবন তো শহরের ফ্ল্যাট বাড়িতেই কাটিয়ে দিলাম! ইট-কাঠের খাঁচা ছেড়ে মেঘদের কাছাকাছি আসাই তো আমার স্বপ্ন ছিল। জানেন, আমার নাম ‘মেঘলা’, অথচ আমি আগে কখনো পাহাড়ি মেঘকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখিনি!

আকাশ: (ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করতে করতে) সব জিনিস কি ছুঁতে হয়? কিছু জিনিস দূর থেকে দেখতেই বেশি সুন্দর লাগে। ছুঁতে গেলে হয়তো উধাও হয়ে যায়।

মেঘলা: (আকাশের দিকে তাকায়, একটু ভেবে) আপনি বড্ড গম্ভীর লোক তো! জীবনটাকে এত জটিল করে ভাবেন কেন? মেঘ ছুঁলে উধাও হয় না, বরং আপনাকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।

(আকাশ মেঘলার চোখের দিকে তাকায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে নরম একুস্টিক গিটারের সুর বাজে।)

দৃশ্য ৩: কঙ্গলাক পাহাড়ের চূড়া

স্থান: কঙ্গলাক পাহাড়

সময়: ভোরবেলা

(পাহাড়ের চারপাশে সাদা মেঘের সমুদ্র। মেঘলা দু'হাত ছড়িয়ে বাতাসের স্বাদ নিচ্ছে। যেন সে মেঘে ভাসছে। আকাশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছাঁয়া থেকে নিঃশব্দে তার ছবি তুলছে।)

মেঘলা: (পেছনে ফিরে আকাশকে দেখে ফেলে) অাই! চুরি করে ছবি তোলা হচ্ছে?

আকাশ: (একটু ধরা পড়ার ভঙ্গিতে) না... মানে, আলোর ফ্রেমটা খুব সুন্দর ছিল। প্রাকৃতিক শট।

মেঘলা: (আকাশের কাছে এসে ক্যামেরাটা দেখতে চায়) দেখি দেখি! কেমন এলো?

(দুজন খুব কাছাকাছি দাঁড়ায়। ক্যামেরা স্ক্রিনে মেঘলার ছবি—বাতাসে তার চুল উড়ছে, পেছনে সাদা মেঘ। দৃশ্যটি অপরূপ।)

মেঘলা: (মুগ্ধ হয়ে) বা রে! ছবিটা তো সত্যিই দারুণ তুলেছেন! আমাকে পাঠাবেন কিন্তু।

আকাশ: পাঠাবো। তবে একটা শর্তে... আজ সারা দিন পাহাড়ের যেখানে যেখানে যাবেন, আমাকে সাথে রাখতে হবে।

মেঘলা: (কপট রাগ দেখিয়ে) শর্ত? বেশ, রাজি! তবে শর্ত একটাই—আজ পুরো দিন আপনার ওই মেজাজী ক্যামেরা বন্ধ রাখতে হবে। শুধু চোখে দেখে পাহাড় উপভোগ করবেন।

দৃশ্য ৪: সম্পর্কের সমীকরণ

স্থান: কটেজের খোলা উঠান / ক্যাম্পফায়ার

সময়: রাত

(ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বলছে। চারপাশে নিস্তব্ধতা। রাহাত, আকাশ ও মেঘলা গানে আর আড্ডায় মেতে আছে। কটেজের মালিক রাহাত গিটার বাজাচ্ছে।)

রাহাত: তা, তোদের দুজনকে দেখে তো মনেই হচ্ছে না যে কালকে তোদের প্রথম পরিচয় হলো! মনে হচ্ছে কত বছরের চেনা।

(আকাশ ও মেঘলা একে অপরের দিকে তাকায়। মেঘলা লজ্জা পেয়ে আগুন পোহানোর ভান করে।)

মেঘলা: রাহাত ভাই, আপনার বন্ধু কিন্তু খুব ভালো ছবি তোলে। তবে মানুষটা খুব অল্প কথা বলে।

আকাশ: কম কথা বলা ভালো মেঘলা। মানুষ যত বেশি কথা বলে, তত নিজের গোপন দুঃখগুলো বাইরে প্রকাশ করে ফেলে।

মেঘলা: (চুপ হয়ে যায়) দুঃখ লুকানো কি এতই জরুরি, আকাশ? কখনো কখনো তো মেঘও জমে জমে ভারী হয়ে গেলে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। আপনি না হয় একটু ঝরেই পড়লেন?

(আকাশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের ট্রাভেল ডায়েরিটা বের করে মেঘলার হাতে দেয়।)

আকাশ: এই ডায়েরিটা আমার জীবনের। কিন্তু সাজেকে আসার পর থেকে এর পাতাগুলো কেন যেন নতুন এক গল্প লিখতে চাইছে...

দৃশ্য ৫: ঝড় ও অনুভূতির প্রকাশ

স্থান: কটেজের বারান্দা

সময়: পরদিন দুপুর

(পাহাড়ে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় ও প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাসের তোড়ে বারান্দার জিনিসপত্র উড়ে যাচ্ছে। মেঘলা ভয় পেয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে।)

আকাশ: (দৌড়ে এসে মেঘলার হাত ধরে ভেতর নিয়ে আসে) মেঘলা! তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? খুব ঠান্ডা লেগে যাবে তো!

মেঘলা: (ভীতু কণ্ঠে, আকাশে দিকে চেয়ে) আকাশ... এই ঝড়টা খুব ভয়ংকর।

আকাশ: (মেঘলার দু'কাঁধ ধরে সোজা করে দাঁড় করায়) কিছু হয়নি, আমি আছি তো। ভয় পেও না।

(মেঘলা আকাশের চোখে চোখ রাখে। বাইরে ঝড়ের গর্জন, ভেতরে নিঃশব্দ ভালোবাসা।)

মেঘলা: তুমি কালকে বললে না, স্পর্শ করলে জিনিস হারিয়ে যায়? আজ দেখো, মেঘ কিন্তু আমাদের ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তুমি কি আমাকেও হারিয়ে যেতে দেবে?

আকাশ: (আবেগে আপ্লুত হয়ে) কখনো না। আমি মেঘের পেছনের নীল আকাশ হতে চাই মেঘলা, যাতে তোমার ঝড়-বৃষ্টি সব সামলে তোমায় আগলে রাখতে পারি।

(আকাশ মেঘলার কপালে হালকা স্পর্শ করে। বৃষ্টির শব্দে যেন ভালোবাসার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।)

দৃশ্য ৬: শেষ দৃশ্য (বিদায় ও সূচনা)

স্থান: সাজেক বাসস্ট্যান্ড / হেলিপ্যাড

সময়: পরের দিন সকাল

(ভোরের রোদ উঠে গেছে। মেঘলা তার ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শহর তাকে আবার ডেকে পাঠিয়েছে। আকাশ পাশে দাঁড়িয়ে আছে।)

মেঘলা: (একটু বিষণ্ণ হাসিতে) তাহলে আসি? শহর আবার আমাকে গিলে খেতে তৈরি।

আকাশ: শহর তোমাকে হয়তো ডাকছে, কিন্তু মেঘের দেশ কি তোমায় ভুলতে পারবে?

মেঘলা: (পকেট থেকে একটি ছোট্ট বাঁশের তৈরি স্মারক বের করে আকাশের হাতে দেয়) এটা রেখে দাও। আর হ্যাঁ, ডায়েরির শেষ পাতাটা কিন্তু আমি লিখে দিয়ে এসেছি।

আকাশ: (অবাক হয়ে) সত্যি? কী লিখেছ?

মেঘলা: (গাড়িতে উঠে বসে, হেসে) গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে! গিয়ে পড়ে নিয়ো। আবার দেখা হবে, আকাশ!

(গাড়িটি আঁকাবাঁকা পথ ধরে নেমে যেতে থাকে। আকাশ ডায়েরিটা খোলে। শেষ পাতায় লেখা—)

"মেঘ একা একা ভাসতে পারে, কিন্তু তার রূপ ফুটে ওঠে তখনই, যখন সে তার নিজের আকাশের দেখা পায়। মেঘের দেশে তুমি আমার সেই আকাশ..."


(আকাশ হেসে কটেজের দিকে ফিরে তাকায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে থিম মিউজিক বেজে ওঠে— 

"নয়ন মেলে তাকাই যখন, দেখি শুধু তোমায়,

তোমার মাঝে নতুন করে হারাই প্রতি সন্ধ্যায়।

তুমি আমার ভোরের আলো, মিষ্টি রোদের হাসি,

কানে কানে বলছি আবার—তোমায় ভালোবাসি।

একলা পথের বাঁকে আমার হাতটি চেপে ধরো,

হৃদয় মাঝে লুকিয়ে রেখে আপন আমায় করো।

তোমার ছোঁয়ায় নিমিষেই দূর স্বপ্নগুলো জাগে,

এমন মায়া, এমন প্রেম তো হয়নি কভু আগে!

তুমি আমার ভোরের আলো, মিষ্টি রোদের হাসি,

কানে কানে বলছি আবার—তোমায় ভালোবাসি।

মেঘের দেশে ভাসবো দুজন ডানা মেলে দূরে,

সুর বাঁধি আজ ভালোবাসার অমলিন এক পুরে।

ঝড় আসুক বা আঁধার নামুক, থাকবো পাশে স্থির,

তুমি আমার শান্ত নদী, তুমি প্রেমের তীর।

চোখের তারায় লেখা আছে গল্প হাজারটা,

তোমার সাথে কাটাতে চাই হাজার জীবনটা।

তুমি আমার মেঘের ছায়া, তুমি শ্রাবণ ধারা,

তোমায় ছাড়া কাটবে না আর জীবন দিশাহারা।


নয়ন মেলে তাকাই যখন, দেখি শুধু তোমায়,

তোমার মাঝে নতুন করে হারাই প্রতি সন্ধ্যায়।

তুমি আমার ভোরের আলো, মিষ্টি রোদের হাসি,

কানে কানে বলছি আবার—তোমায় ভালোবাসি।"

স্ক্রিন ধীরে ধীরে ডার্ক হয়ে নাটক শেষ হয়।)

— সমাপ্ত —

ধারাবাহিক নাটকঃরোদ-ছায়ার উঠোন_লেখকঃকিশোর দুলাল রায়

নাটকঃ রোদ-ছায়ার উঠোন 

মূল চরিত্রসমূহ:

  • রাশেদ সাহেব (৬০): পরিবারের অভিভাবক। একজন অবসরপ্রাপ্ত সৎ সরকারি কর্মকর্তা।
  • ফাতেমা বেগম (৫৫): রাশেদ সাহেবের স্ত্রী। মায়াবতী ও পুরো পরিবারকে আগলে রাখা মা।
  • আসিফ (২৮): বড় ছেলে। দায়িত্ববান, শান্ত কিন্তু বেকারত্বের গ্লানিতে ভুগছে।
  • আরিফ (২৫): ছোট ছেলে। চঞ্চল, আধুনিক এবং দ্রুত বড়লোক হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার।
  • মায়া (২২): একমাত্র মেয়ে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। চঞ্চল, হাসিখুশি ও পুরো বাড়ির প্রাণ।
  • সুমি (২৬): আরিফের স্ত্রী। অহংকারী, হিংসুটে এবং সবসময় নিজেকে অন্যের চেয়ে সেরা প্রমাণ করতে ব্যস্ত।

​📺 পর্ব ১

হাসিমুখের আড়ালে মেঘ

(দৃশ্য ১: রাশেদ সাহেবের বসার ঘর - সকাল)

মধ্যবিত্ত গোছানো একটা ঘর। রাশেদ সাহেব চশমা চোখে খবরের কাগজ পড়ছেন। ফাতেমা বেগম চা নিয়ে এলেন।

ফাতেমা: (চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে) হ্যাঁগো, আসিফের চাকরিটার কিছু হলো? ছেলেটা মুখে কিছু বলে না, কিন্তু সারারাত জেগে থাকে। বুকটা ফেটে যায় দেখতে।

রাশেদ সাহেব: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) সততার দাম এই সমাজে কম, ফাতেমা। ও তো কোনো অনৈতিক উপায়ে চাকরি নেবে না। একটু ধৈর্য ধরো, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।

(এমন সময় আরিফ আর সুমি ড্রয়িংরুমে ঢোকে। সুমির হাতে একটা দামি শাড়ির প্যাকেট।)

সুমি: (উচ্চস্বরে, যেন সবাই শুনতে পায়) আম্মা, দেখেন আমার ভাইয়া ইন্ডিয়া থেকে কী সুন্দর সিল্কের শাড়ি পাঠিয়েছে! আজকালকার দিনে অবশ্য এসব দামি শাড়ি দেওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না।

আরিফ: (স্মার্টফোন টিপতে টিপতে) আরে সুমি, সবাইকে ওসব দেখিয়ে কী হবে? যার ভাগ্য ভালো সে এমনিতেই পায়।

ফাতেমা: (খানিকটা মলিন হেসে) খুব সুন্দর হয়েছে মা। আল্লাহ তোমার ভাইকে ভালো রাখুক।

(দৃশ্য ২: বাড়ির ছাদ - বিকেল)

মায়া আর আসিফ ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া বুঝতে পারছে তার বড় ভাইয়া মানসিকভাবে কতটা চাপে আছে।

মায়া: (আসিফের কাঁধে হাত রেখে) কী রে বড় ভাইয়া? মুখটা এমন শুকিয়ে রেখেছিস কেন? তোর কি মন খারাপ?

আসিফ: (জোর করে হেসে) ধুর পাগলী! মন খারাপ হতে যাবে কেন?

মায়া: তুই আমার থেকে লুকাতে পারবি না। জানি, চাকরিটা এবারও হয়নি। কিন্তু মনে রাখিস, তুই এই শহরের সবচেয়ে সেরা ভাই। তোর মেধা আছে, একদিন তুই ঠিক সফল হবি। তখন তোর এই বোন তোর টাকায় আইসক্রিম খাবে!

আসিফ: (হেসে ফেলে মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়) তুই আসলেই আমার ঘরের লক্ষ্মী রে। তোর এই হাসিটাই আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।

(দৃশ্য ৩: আরিফ ও সুমির ঘর - রাত)

রুমে সুমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে গহনা গোছাচ্ছে। আরিফ বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপ দেখছে। সুমির চোখেমুখে এক অদ্ভুত হিংসার চাদর।

সুমি: (বিরক্ত হয়ে) আচ্ছা আরিফ, তোমার এই বড় ভাইয়া আর কতদিন আমাদের ঘাড়ে বসে খাবে? তোমার বাবা তো রিটায়ার্ড। এখন সংসারের সিংহভাগ খরচ তো তুমিই চালাও।

আরিফ: (একটু বিরক্ত হয়ে) সুমি, ভাইয়া চেষ্টা করছে। তাছাড়া এটা ভাইয়ারও বাড়ি।

সুমি: বাড়ি বললেই হলো? তোমার বাবা তো ফ্ল্যাটটা এখনো কারও নামে লিখে দেননি। তুমি যদি এখনই নিজের ভাগ বুঝে না নাও, তবে ওই বেকার ভাইয়া আর বোনটাই সব গিলে খাবে। আমি কিন্তু আমার বাচ্চার ভবিষ্যৎ এভাবে নষ্ট হতে দেব না!

আরিফ: (কিছুক্ষণ চুপ থেকে, সুমির কথায় প্রভাবিত হয়ে) হুম... তুমি ভুল বলোনি। বাবা ইদানীং আসিফ ভাইয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। আমাকে কিছু একটা করতেই হবে।

(দৃশ্য ৪: ডাইনিং টেবিল - রাত)

পুরো পরিবার একসাথে রাতের খাবার খাচ্ছে। আনন্দ-হাসির মাঝেই হঠাৎ ছন্দপতন।

রাশেদ সাহেব: আসিফ, কাল সকালে আমার সাথে একটু ব্যাংকে যাবি। আমার পেনশনের কিছু কাজ বাকি আছে।

আরিফ: (হঠাৎ চামচ টেবিলে ছুড়ে মেরে) বাবা, সব কাজে আসিফ ভাইয়াকে কেন লাগবে? ও তো একটা টাকাও সংসারে দেয় না। অথচ দিনশেষে সব সিদ্ধান্ত ও-ই নেয়!

ফাতেমা: (হতভম্ব হয়ে) আরিফ! ও তোর বড় ভাই, ওভাবে কথা বলছিস কেন?

সুমি: (আরিফকে সমর্থন করে) মা, আরিফ তো ভুল কিছু বলেনি। সংসারে যে টাকা দেয়, তার কথার কোনো মূল্য নেই এই বাড়িতে।

আসিফ: (মাথা নিচু করে, চোখে জল আটকে) আরিফ, সুমি... তোমরা ভুল বুঝো না। আমি কাল যাব না বাবা, আরিফই যাক। আমার একটু তাড়া আছে।

(আসিফ না খেয়ে টেবিল থেকে উঠে নিজের ঘরে চলে যায়। মায়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। রাশেদ সাহেব স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন।)

​📌 আগামী পর্বের আকর্ষণ:

  • ​আসিফ একটা সাধারণ কোম্পানিতে ডেলিভারি বয়ের কাজ শুরু করে, যা দেখে সুমি পাড়ায় মহলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে।
  • ​মায়ার বিয়ে ঠিক হয় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে, কিন্তু সুমি সেই বিয়ে ভাঙার জন্য গোপনে মেয়ের বাড়ির লোকজনকে আসিফের বেকারত্ব নিয়ে আজেবাজে কথা বলে।
  • ​আরিফ যখন ব্যবসায় বড়সড় প্রতারণার শিকার হয়ে জেলে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন এই "বেকার" বড় ভাই আসিফই নিজের সবকিছু বাজি রেখে ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে।

নাটকের মূল বার্তা: বাস্তব জীবনে হিংসা আর লোভ সাময়িকভাবে মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে, কিন্তু দিনশেষে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, রক্ত ও পরিবারের বন্ধনই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।


​📺 পর্ব ২

তপ্ত রোদ আর স্বার্থের ছায়া

(দৃশ্য ১: রাশেদ সাহেবের বসার ঘর - সকাল)

রাতের ঝগড়ার পর সকালের পরিবেশটা বেশ থমথমে। আসিফ কাঁধে একটা সাধারণ ব্যাগ ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফাতেমা বেগম রান্নাঘর থেকে চোখ মুছতে মুছতে বের হলেন।

ফাতেমা: (আসিফের হাত ধরে) বাবা আসিফ, না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস? কাল রাতে আরিফ আর সুমি যা বলেছে, তার জন্য আমি ওদের হয়ে তোর কাছে মাফ চাচ্ছি রে বাবা। তুই এভাবে মুখ কালো করে থাকিস না।

আসিফ: (মৃদু হেসে মায়ের হাত জড়িয়ে ধরে) আরে আম্মা, তুমি পাগল হয়েছ? ও আমার ছোট ভাই, ও একটু রাগ করতেই পারে। আমি কোনো মনে কষ্ট রাখিনি। আসলে আজ আমার একটা ইন্টারভিউ আছে, তাই একটু জলদি বের হচ্ছি। দোয়া করো।

ফাতেমা: (মাথায় হাত দিয়ে) আল্লাহ তোকে সফল করুক, বাপ।

(আসিফ বের হতেই আড়াল থেকে সুমি মুখ বাঁকিয়ে কুটিল হাসে।)

সুমি: (মনে মনে) ইন্টারভিউ নাকি ঘোরার বাহানা! আজই পাড়ার ঘটক ঘটকালি আপাকে ডাকতে হবে। মায়ার বিয়েটা এই বাড়ি থেকে যত দ্রুত বিদায় করা যায়, ততই ভালো।

(দৃশ্য ২: শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তা - দুপুর)

প্রচণ্ড রোদ। আসিফ ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে, মাথায় একটা ক্যাপ দিয়ে মোটরসাইকেলে করে বড় বড় পার্সেল ডেলিভারি দিচ্ছে। সে আসলে একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি বয় হিসেবে জয়েন করেছে, কিন্তু পরিবারকে জানায়নি।

​মেধার এত বড় অবমূল্যায়ন আর রোদের তাপে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে চায়, তাও সে নিজেকে শক্ত রাখে।

আসিফ: (নিজের মনে) সংসারে অভাব আর অবহেলা থাকলে ইগো ধরে রেখে লাভ নেই। বাবার পেনশনের টাকা দিয়ে কতদিন চলবে? আমাকে তো একটা কিছু করতেই হতো।

(দৃশ্য ৩: রাশেদ সাহেবের বাড়ির উঠোন - বিকেল)

উঠোনে সুমি আর পাড়ার ঘটক ঘটকালি আপা বসে চা খাচ্ছেন। মায়াও সেখানে কাপড় শুকাতে দিচ্ছিল।

ঘটকালি আপা: বুঝলে সুমি বউমা, পাত্র কিন্তু এক্কেবারে রাজপুত্তুর! লন্ডনে থাকে, নিজের ব্যবসা আছে। মেয়ে পছন্দ হলেই কাজী ডেকে বিয়ে।

সুমি: (মায়ার দিকে ইশারা করে উচ্চস্বরে) পাত্র তো ভালো হবেই আপা। তবে আমাদের মায়াকে নিলে কিন্তু পাত্রপক্ষকে একটু মানিয়ে নিতে হবে।

ঘটকালি আপা: (অবাক হয়ে) কেন? মায়া তো দেখতে পরীর মতো, পড়াশোনাতেও ভালো!

সুমি: (মিথ্যা আফসোসের ভান করে) আরে আপা, রূপ দিয়ে কি পেট ভরে? মায়ার বড় ভাই আসিফ ভাইয়াকে তো চেনেন? এমএ পাস করে ঘরে বসে থাকে, কোনো কাজকাম নেই। আজকাল তো শুনছি রাস্তায় রাস্তায় মানুষের পার্সেল টানে! এমন বেকার আর ছোটলোক ভাই ঘরে থাকলে ভালো ঘরের মানুষ কি সহজে কুটুম্বিতা করতে চায়? আপনারা একটু চেপে যাবেন পাত্রপক্ষের কাছে, কেমন?

(মায়ার হাত থেকে কাপড়ের বালতিটা পড়ে যায়। সে সুমির এমন অপমানজনক কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।)

মায়া: (কেঁদে ফেলে) ভাবি! বড় ভাইয়া সম্পর্কে এত বড় মিথ্যা কথা তুমি কীভাবে বললে? ভাইয়া চাকরি খুঁজছে, ও কোনো ছোটলোক নয়!

সুমি: (চেঁচিয়ে) মিথ্যা কেন হবে? নিজের চোখে দেখে এসো তোমার ভাইয়া রাস্তায় কী করে! সতীন-কাঁটা দূর করতে চাইলে পাত্রপক্ষকে সত্যি-মিথ্যা মিলিয়েই বলতে হয়, বুঝলে?

(দৃশ্য ৪: আরিফের অফিস - সন্ধ্যা)

আরিফ তার এক বন্ধুর সাথে বসে কফি খাচ্ছে। আরিফের চোখেমুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা।

বন্ধু: দেখ আরিফ, এই রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টে যদি তুই মাত্র ১০ লাখ টাকা ইনভেস্ট করতে পারিস, তবে আগামী তিন মাসে তোর টাকা ডাবল হয়ে যাবে। তুই এক ধাক্কায় কোটিপতি!

আরিফ: (উত্তেজিত হয়ে) ১০ লাখ টাকা? কিন্তু এত টাকা আমি হুট করে কোথায় পাব? আমার সেভিংস তো মাত্র ৩ লাখ।

বন্ধু: কেন? তোর বাবার ওই ফ্ল্যাটটা আছে না? ওইটার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা পেপারস দেখিয়ে ব্যাংক থেকে একটা শর্ট টার্ম লোন নিয়ে নে। ভাইয়া তো বেকার, ও কিছু বুঝবে না। লোন শোধ করে দিবি তিন মাসে, কেউ জানবেও না!

আরিফ: (একটু ইতস্তত করে) বাবার সই জাল করতে হবে? যদি ধরা পড়ে যাই?

বন্ধু: আরেহ! তুই তো তোর বাপেরই সন্তান। তুই বড়লোক হলে তো তোর বাপেরই নাম হবে। একটু রিস্ক না নিলে লাইফে বড় হওয়া যায় না, দোস্ত!

(আরিফ লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারছে না সে এক মহাবিপদের দিকে পা বাড়াচ্ছে।)

(দৃশ্য ৫: রাশেদ সাহেবের বসার ঘর - রাত)

রাতে আসিফ বাড়ি ফেরে। শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত, পা চলছে না। বসার ঘরে রাশেদ সাহেব গম্ভীর মুখে বসে আছেন। মায়াও এক কোণে কাঁদছে।

রাশেদ সাহেব: (কঠোর গলায়) আসিফ! তুই নাকি কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি বয়ের কাজ করছিস? রাস্তায় রাস্তায় মানুষের দুয়ারে পার্সেল পৌঁছাচ্ছিস?

আসিফ: (অবাক হয়ে) বাবা... আপনি কীভাবে জানলেন?

রাশেদ সাহেব: সুমি আজ বিকেলে পাড়ার লোকের মুখে শুনেছে। তুই এত বড় ডিগ্রি নিয়ে এই ছোট কাজ করছিস? আমার মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিলি!

আসিফ: (ধীরস্থিরভাবে বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে) বাবা, কোনো কাজই ছোট নয়। চুরি বা ডাকাতি করার চেয়ে সততার সাথে মানুষের পার্সেল পৌঁছে দেওয়া অনেক সম্মানের। আমি বেকার বসে থেকে আপনার ওপর বোঝা হতে চাইনি।

(আসিফের এই জবাবে রাশেদ সাহেব কোনো কথা বলতে পারেন না। সুমি আর আরিফ দরজার আড়াল থেকে মুচকি হাসে।)

আসিফ: (আরিফ ও সুমির দিকে তাকিয়ে) আর হ্যাঁ, আমার এই ছোট কাজের জন্য যদি মায়ার বিয়েতে কোনো সমস্যা হয়, তবে আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। আমার বোনের সুখের জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।

(মায়া এসে আসিফকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। পুরো ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে, যা ঝড় ওঠার আগের পূর্বাভাস।)

​📌 আগামী পর্বের আকর্ষণ:

  • ​আরিফ জালিয়াতি করে রাশেদ সাহেবের ফ্ল্যাটের দলিল বন্ধক রেখে লোন নেয় এবং তার বন্ধু সেই টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
  • ​ব্যাংক থেকে যখন বাড়ি ক্রোক করার নোটিশ আসে, তখন হৃদরোগে আক্রান্ত হন রাশেদ সাহেব।
  • ​পরিবারের এই চরম বিপদে সুমি তার বাপের বাড়ি চলে যায়, আর "ডেলিভারি বয়" আসিফ একাই পুরো পরিস্থিতি সামলানোর চ্যালেঞ্জ নেয়।

​📺 পর্ব ৩

লোভের ফাঁদ আর ভাঙনের সুর

(দৃশ্য ১: আরিফের বন্ধুর অফিস - সকাল)

অফিস কক্ষটি বেশ বিলাসবহুল। আরিফ একটা কালো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে খুব সতর্কভাবে ঘরে ঢোকে। তার চোখ-মুখে ভয় আর উত্তেজনার ছাপ। বন্ধু সায়মন ড্রয়ার থেকে কিছু কাগজ বের করে টেবিলে রাখল।

সায়মন: (মুচকি হেসে) কী দোস্ত? পেপারস রেডি? সাইন এনেছিস তো?

আরিফ: (ব্যাগ থেকে দলিল বের করে) হ্যাঁ, এনেছি। বাবার সইটা হুবহু নকল করতে আমার হাত কাঁপছিল রে। ব্যাংক থেকে লোনের ১০ লাখ টাকা তো আজই রিলিজ হবে, তাই না?

সায়মন: (দলিলটা লুফে নিয়ে) একদম! তুই শুধু টাকাটা আমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার কর। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই রিয়েল এস্টেটের প্রজেক্ট বুক হয়ে যাবে। তারপর দেখবি, তোর এই ভাঙা বাড়ির উঠোনে রোদ নয়, সোনায় মোড়ানো আলো চকচক করবে!

আরিফ: (মনে মনে) এবার দেখাব আসিফ ভাইয়াকে, কে আসল ছেলে আর কার কত ক্ষমতা!

(দৃশ্য ২: রাশেদ সাহেবের বাড়ির রান্নাঘর - দুপুর)

ফাতেমা বেগম রান্না করছেন। মায়া পাশে বসে সবজি কাটছে, কিন্তু তার মন ভালো নেই। গতদিনের ঘটনার পর সে বড় ভাইয়ার মুখটা দেখলেই কেঁদে ফেলছে।

মায়া: আম্মা, বড় ভাইয়া তো আজ সকাল থেকে একটা দানাও মুখে দেয়নি। কুরিয়ারের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রোদের মধ্যে বের হয়ে গেল। ভাবি কীভাবে পারল ভাইয়াকে সবার সামনে এত ছোট করতে?

ফাতেমা: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) সুমির স্বভাবটাই এমন রে মা। কিন্তু আমার ভয় অন্য জায়গায়—তোর আব্বা কাল রাত থেকে একটা কথাও বলেনি। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে আছে। এই ঘরের রোদটুকু যেন আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে।

(এমন সময় সুমি রান্নাঘরে ঢুকে একটা দামি ক্যাটালগ টেবিলের ওপর ছুড়ে মারে।)

সুমি: (অহংকারের সুরে) আম্মা, ঘটকালি আপা জানালেন পাত্রপক্ষ নাকি কাল বিকেলে মায়াকে দেখতে আসবে। আমি কিন্তু আমার বাবার বাড়ি থেকে ভালো ক্যাটারিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। ওই কুরিয়ার বয় ভাইয়াকে কিন্তু কাল বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করতে বারণ করবেন। পাত্রপক্ষ দেখলে কী ভাববে?

মায়া: (ঝাঁঝালো গলায়) ভাবি! মুখ সামলে কথা বলো। আমার বিয়ে হোক আর না হোক, আমার ভাইয়া এই বাড়ির প্রথম সন্তান। তাকে অপমান করার অধিকার তোমার নেই!

(দৃশ্য ৩: একটি অভিজাত রেস্তোরাঁ - বিকেল)

লন্ডন প্রবাসী পাত্র তার মায়ের সাথে বসে আছে। সুমি আর আরিফ তাদের সাথে কথা বলছে। সুমি পাত্রপক্ষকে পটাতে ব্যস্ত।

পাত্রের মা: আমাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে। কিন্তু শুনলাম মেয়ের বড় ভাই নাকি... মানে সাধারণ কোনো কাজ করেন?

সুমি: (তাড়াতাড়ি কথা কেড়ে নিয়ে) আরে না খালাম্মা! ওসব পাড়ার লোকের রটানো কথা। আসিফ ভাইয়া আসলে একটা বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির "লজিস্টিকস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজার"! ওনার আন্ডারে শত শত পার্সেল আর গাড়ি চলে।

আরিফ: (একটু অস্বস্তি নিয়ে) হ্যাঁ... মানে ভাইয়া আসলে একটু ফিল্ড ওয়ার্ক পছন্দ করে তো, তাই।

পাত্র: ওহ, দ্যাটস গ্রেট! তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই। আমরা কালই আপনাদের বাড়ি আসছি পাকা কথা বলতে।

(দৃশ্য ৪: রাশেদ সাহেবের বসার ঘর - রাত)

রাতে আসিফ বাড়ি ফেরে। সারাদিনের খাটুনিতে তার শার্ট ঘামে ভেজা। ঘরে ঢুকতেই সে দেখে রাশেদ সাহেব লিভিং রুমের সোফায় বসে বুক চেপে ধরে আছেন। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

আসিফ: (ছুটে গিয়ে) বাবা! কী হয়েছে আপনার? আম্মা, মায়া... তাড়াতাড়ি এসো!

রাশেদ সাহেব: (ক্ষীণ কণ্ঠে) আসিফ... আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে রে। কেমন যেন ছটফট লাগছে।

(ফাতেমা বেগম আর মায়া চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বের হয়। এমন সময় আরিফ আর সুমি বাইরে থেকে হাসতে হাসতে ঘরে ঢোকে।)

আসিফ: (আরিফকে দেখে চেঁচিয়ে) আরিফ! তুই কোথায় ছিলি? দেখ বাবার কী অবস্থা! তাড়াতাড়ি একটা সিএনজি বা ট্যাক্সি ডাক, বাবাকে হাসপাতালে নিতে হবে!

সুমি: (বিরক্ত হয়ে) উফ! বড়দা, সবসময় এত নাটক কেন করেন? বাবা তো প্রায়ই এমন করে। আজ আমরা এত বড় একটা ভালো খবর নিয়ে এলাম, আর আপনি এসেই সিন ক্রিয়েট করছেন?

আসিফ: (রেগে গিয়ে সুমির দিকে আঙুল উঁচিয়ে) সুমি! চুপ করো! এটা কোনো নাটক নয়। আরিফ, তুই গাড়ি ডাকবি নাকি আমি বাবাকে পিঠে করে নিয়ে যাব?

(আরিফ বাবার অবস্থা দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে যায় এবং ফোন বের করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে উদ্যত হয়।)

(दृश्य ৫: হাসপাতালের করিডোর - গভীর রাত)

রাশেদ সাহেবকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়েছে। ডাক্তাররা ভেতরে কাজ করছেন। বাইরে আসিফ অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। মায়া আর ফাতেমা বেগম কাঁদছেন। আরিফ এক কোনায় দাঁড়িয়ে সায়মনকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সায়মনের ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে।

আরিফ: (মনে মনে, ঘামতে ঘামতে) সায়মনের ফোন বন্ধ কেন? ও তো বলেছিল আজ রাতের মধ্যেই লোন পাসের কনফার্মেশন মেসেজ আসবে। কোনো ঝামেলা হলো না তো?

(এমন সময় ডাক্তার কেবিন থেকে বের হয়ে এলেন। সবার মুখে উৎকণ্ঠা।)

ডাক্তার: রাশেদ সাহেবের ফ্যামিলি কে?

আসিফ: (সামনে এগিয়ে) আমি ওনার বড় ছেলে। বলুন ডাক্তার বাবু, বাবা কেমন আছেন?

ডাক্তার: ওনার একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। মানসিক কোনো বড় আঘাত বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থেকে এটা হয়েছে। আপাতত আমরা ওনাকে অবজারভেশনে রেখেছি। তবে হাসপাতালের বিল আর ওষুধের জন্য এখনই কিছু টাকা জমা দিতে হবে। প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাগবে।

(৫০ হাজার টাকার কথা শুনে আরিফ আর সুমি পিছিয়ে যায়।)

সুমি: (আরিফের কানে কানে) আরিফ, তোমার কাছে তো কোনো টাকা নেই। খবরদার, তুমি দিতে যেও না। সব টাকা ওই প্রজেক্টে লকড।

আসিফ: (এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের পকেট থেকে জমানো টাকা এবং মেসের বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নেওয়া কিছু টাকা বের করে) ডাক্তার বাবু, এখানে ৩০ হাজার টাকা আছে। আমি বাকি ২০ হাজার টাকা এক ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো উপায়ে জোগাড় করে আনছি। আপনি বাবার চিকিৎসা শুরু করুন, প্লিজ!

(আসিফ যখন টাকার জন্য হাসপাতালের বাইরে দৌড়ে যায়, তখন আরিফের ফোনে একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ আসে। মেসেজটি দেখেই আরিফের হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়। সায়মন ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে এবং ব্যাংক আগামীকালই রাশেদ সাহেবের বাড়ি ক্রোক করার জন্য নোটিশ পাঠাচ্ছে!)

​📌 আগামী পর্বের আকর্ষণ:

  • ​পরদিন সকালে পাত্রপক্ষ মায়াকে দেখতে আসার ঠিক আগ মুহূর্তে বাড়িতে হাজির হয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
  • ​জালিয়াতির কথা জানতে পেরে সুমি আরিফকে ডিভোর্সের হুমকি দিয়ে নিজের সব গহনা নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়।
  • ​অসহায় আরিফ যখন পুলিশের ভয়ে পালাচ্ছে, তখন ডেলিভারি বয় আসিফ কীভাবে নিজের পরিবার আর বাবার সম্মান রক্ষা করবে?

​📺 পর্ব ৪

ঝড়ের রাতে ছায়ার বিদায়, রোদ কি আসবে?

(দৃশ্য ১: হাসপাতালের করিডোর - ভোর)

আসিফ হাঁপাতে হাঁপাতে করিডোরে ঢোকে। সারারাত চেনা-অচেনা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে, নিজের মোটরসাইকেলটা বন্ধক রেখে সে বাকি ২০ হাজার টাকা জোগাড় করেছে। তার চোখ দুটো লাল, চেহারায় চরম ক্লান্তি। সে এসে দেখে আরিফ করিডোরের এক কোনায় মাথা নিচু করে কাঁপছে।

আসিফ: (আরিফের কাঁধে হাত দিয়ে) আরিফ, টাকা জোগাড় হয়ে গেছে। আমি কাউন্টারে জমা দিয়ে আসছি। তুই এত কাঁদছিস কেন? ডাক্তার বাবু কি নতুন কোনো খারাপ খবর দিয়েছেন? বাবা ঠিক আছেন তো?

আরিফ: (আসিফের পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে) ভাইয়া! আমাকে মাফ করে দাও। আমি শেষ হয়ে গেছি! আমি লোভের মুখে পড়ে নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছি ভাইয়া!

আসিফ: (হতভম্ব হয়ে আরিফকে টেনে তোলে) কী হয়েছে পরিষ্কার করে বল! সায়মন প্রজেক্টের কী করেছে?

আরিফ: (কাঁদতে কাঁদতে) সায়মন কোনো প্রজেক্ট করেনি ভাইয়া। ও একটা প্রতারক! ও বাবার সই জাল করে আমাদের এই বসতবাড়িটা ব্যাংকে বন্ধক রেখে ১০ লাখ টাকা লোন তুলে আজ রাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। ব্যাংক আজ সকালেই আমাদের বাড়ি ক্রোক করতে লোক পাঠাবে!

(কথাটা শুনে আসিফের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যায়। কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করে, কারণ সে ভেঙে পড়লে পুরো পরিবার ভেসে যাবে।)

(দৃশ্য ২: রাশেদ সাহেবের বাড়ির বসার ঘর - সকাল ১০টা)

লন্ডন প্রবাসী পাত্র তার মা-বাবাকে নিয়ে বসার ঘরে বসে আছে। ফাতেমা বেগম আর মায়াও মলিন মুখে বসে আছেন। সুমি দামি শাড়ি পরে পাত্রপক্ষের সামনে চা-নাস্তা পরিবেশন করছে এবং নিজের বাপের বাড়ির বড়ত্ব প্রকাশ করছে।

পাত্রের বাবা: আমাদের মেয়েকে খুব পছন্দ হয়েছে। আমরা চাচ্ছিলাম আগামী মাসেই শুভ কাজটা সেরে ফেলতে। রাশেদ সাহেব হাসপাতালে, তাই ওনার অনুমতিটা...

সুমি: (হেসে) ওনার অনুমতি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই খালাম্মা। এই বাড়ির সব বড় সিদ্ধান্ত তো আসলে আমার স্বামী আরিফ আর আমিই নিই। আপনারা নিশ্চিন্তে...

(এমন সময় বাইরে থেকে হুড়মুড় করে কয়েকজন কোট-টাই পরা ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং সাথে দুজন পুলিশ ঘরে ঢোকে। তাদের হাতে ক্রোকের লাল নোটিশ।)

ব্যাংক কর্মকর্তা: (উচ্চস্বরে) এই বাড়ির মালিক রাশেদ সাহেবের পরিবার কে আছেন? জালিয়াতি ও লোন ডিফল্টের দায়ে এই বাড়ি এখন সরকারি হেফাজতে নেওয়া হচ্ছে। আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে আপনাদের বাড়ি খালি করতে হবে!

পাত্রের মা: (লাফিয়ে উঠে) ওমা! এসব কী শুনছি? ব্যাংক ক্রোক করতে এসেছে? জালিয়াতির মামলা?

সুমি: (ফ্যাকাশে হয়ে) আপনারা ভুল করছেন! এটা রাশেদ সাহেবের বাড়ি, আমার শ্বশুরের বাড়ি! আমার স্বামী তো...

পুলিশ কর্মকর্তা: আপনার স্বামী আরিফ হোসেনই বাবার জাল সই দিয়ে এই লোনটা করিয়েছে এবং মূল হোতা সায়মন পলাতক। আরিফ হোসেনের নামেও অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে!

(পাত্রপক্ষ এক মুহূর্তও দেরি না করে বসার ঘর থেকে উঠে চলে যায়। পাত্রের মা যেতে যেতে বলেন, "এমন জালিয়াতি আর পুলিশ কেসের পরিবারে আমরা ছেলের বিয়ে দেব না!")

(দৃশ্য ৩: সুমির ঘর - সকাল ১১টা)

ঘরজুড়ে জিনিসপত্র ছিটানো। সুমি আলমারি খুলে তার সব গহনা এবং দামি শাড়ি ব্যাগে ভরছে। ফাতেমা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছেন।

ফাতেমা: (কেঁদে কেঁদে) বউমা, বিপদের দিনে এভাবে আমাদের ফেলে চলে যাচ্ছো? আরিফ ভুল করেছে, কিন্তু তুমি তো এই বাড়ির অংশ!

সুমি: (ঝাঁঝালো গলায় ব্যাগ আটকাতে আটকাতে) কিসের অংশ? ওই চোর আর জালিয়াত আরিফের সাথে আমি এক সংসার করব? ও তো জেলে যাবে। আর এই ভাঙা বাড়ি তো ব্যাংক নিয়েই নিচ্ছে। আমি আমার বাপের বাড়ির দেওয়া গহনা একটাও এই চোরের বংশের জন্য রেখে যাব না। আজই আমি আমার বাবাকে দিয়ে ডিভোর্সের নোটিশ পাঠাব!

(সুমি ব্যাগ নিয়ে মায়া আর ফাতেমা বেগমকে ধাক্কা দিয়ে উঠোন পেরিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। উঠোনের রোদটা যেন মুহূর্তে তপ্ত ছায়ায় রূপ নেয়।)

(দৃশ্য ৪: হাসপাতালের আইসিইউ-র বাইরে - দুপুর)

আসিফ আর আরিফ দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য হাসপাতালের বাইরে আসছিল। এমন সময় পুলিশ এসে আরিফকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।

পুলিশ: আরিফ হোসেন? আপনি আন্ডার অ্যারেস্ট। বাবার সই জাল করে ব্যাংক জালিয়াতির অভিযোগে আপনাকে থানায় যেতে হবে।

আরিফ: (ভয়ে আসিফের পেছনে লুকিয়ে) ভাইয়া! আমাকে বাঁচাও! আমি জেলে গেলে মরে যাব ভাইয়া! আমি বুঝতে পারিনি সায়মন এমন করবে!

আসিফ: (পুলিশের সামনে হাত জোড় করে) অফিসার, আমার ভাই ভুল করেছে। ও প্রতারণার শিকার হয়েছে। ও অপরাধী নয়।

পুলিশ: সেটা আদালতে প্রমাণ হবে। আইন নিজের গতিতে চলবে। সরুন আমাদের কাজ করতে দিন।

(পুলিশ আরিফকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে। আরিফ চিৎকার করে কাঁদতে থাকে, "ভাইয়া, আমাকে বাঁচাও!" আসিফ স্তব্ধ হয়ে গাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ দিয়ে এবার জল গড়িয়ে পড়ে।)

(দৃশ্য ৫: থানার লক-আপ - বিকেল)

লক-আপের ভেতর আরিফ মেঝেতে বসে কাঁদছে। আসিফ লোহার শিকের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। আসিফের চোখে কোনো রাগ নেই, আছে শুধু এক ভাইয়ের জন্য আরেক ভাইয়ের অসীম মায়া।

আরিফ: (শিকের ফাঁক দিয়ে আসিফের হাত ধরে) ভাইয়া, সুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। সব গহনা নিয়ে গেছে। যে সুমির কথায় আমি তোমাকে এত অপমান করলাম, সে-ই আজ বিপদে আমাকে লাথি মেরে চলে গেল। আর তুমি... তুমি এখনো আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছো?

আসিফ: (আরিফের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে) তুই ভুল করেছিস আরিফ, কিন্তু তুই আমার ভাই। আমাদের শরীরে একই বাবার রক্ত। সুমি তোর সুখের দিনে পাশে ছিল, দুঃখের দিনে চলে গেছে—এটাই বাস্তব জীবন। কিন্তু তোর এই "বেকার" বড় ভাই তোকে এই নরকে পচতে দেবে না।

আরিফ: (কেঁদে ফেলে) কিন্তু আমাদের বাড়ি তো ব্যাংক সিলগালা করে দিচ্ছে! আম্মা আর মায়া কোথায় দাঁড়াবে ভাইয়া?

আসিফ: (দৃঢ় গলায়) যতক্ষণ এই বড় ভাই বেঁচে আছে, তোদের কাউকে আমি রাস্তায় দাঁড়াতে দেব না। আমি আইনি লড়াই লড়ব। সায়মনকে পুলিশ খুঁজে বের করবেই। আর ব্যাংকের লোন শোধ করার জন্য যদি আমাকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ডেলিভারির কাজ করতে হয়, আমি তা-ই করব। তুই শক্ত হ আরিফ, তোর ভাই এখনো হেরে যায়নি!

(আসিফের এই দৃঢ়তা আর ভালোবাসার সামনে আরিফের অহংকার আর হিংসার দেয়াল পুরোপুরি ধুলোয় মিশে যায়।)

​📌 আগামী পর্বের আকর্ষণ:

  • ​আসিফ তার মেসের বন্ধুদের সহায়তায় এবং নিজের জমানো শেষ সম্বল দিয়ে আম্মা আর মায়ার জন্য একটা ছোট দুই রুমের টিনের ঘর ভাড়া করে।
  • ​মায়া তার বড় ভাইয়ার কষ্ট কমাতে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি শুরু করে এবং আসিফের কুরিয়ার সার্ভিসের কাজে গোপনে সাহায্য করার চেষ্টা করে।
  • ​হঠাৎ করেই কুরিয়ার সার্ভিসের হেড অফিস থেকে আসিফের সততা ও পরিশ্রম দেখে তাকে এক বড় প্রোমোশনের চিঠি দেওয়া হয়, যা তাদের জীবনে নতুন রোদের আভাস আনে।

​📺 পর্ব ৫: টিনের চালে বৃষ্টির সুর, অন্ধকারের পর আলোর রোদ্দুর

(দৃশ্য ১: একটি ছোট টিনের বাড়ি - সকাল)

শহরের এক কোণে সস্তায় ভাড়া নেওয়া ছোট দুই রুমের একটি টিনের বাড়ি। চারপাশের পরিবেশটা জরাজীর্ণ হলেও ঘরটা বেশ পরিপাটি। ফাতেমা বেগম চুলায় ভাত বসাচ্ছেন, ওনার চোখ দুটো এখনো ফোলা। মায়া ঘরের মেঝে ঝাড়ু দিচ্ছে। এমন সময় আসিফ তার কুরিয়ারের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ঘরে ঢোকে।

আসিফ: (হাতে একটা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে হাসিমুখে) আম্মা, দেখো তোমাদের জন্য গরম গরম পরোটা আর ভাজি নিয়ে এসেছি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।

ফাতেমা: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) বাবা আসিফ, তুই আমাদের জন্য এত করছিস, আর তোর ওই ছোট ভাইটা আজ তিনদিন ধরে থানার লক-আপে শুধু ডাল-ভাত খাচ্ছে। ও তো কোনোদিন এসব কষ্ট করেনি রে বাবা। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।

আসিফ: (মায়ের মাথায় হাত রেখে) আম্মা, চিন্তা করো না। আমি লয়ারের সাথে কথা বলেছি। সায়মন যে জালিয়াতি করে আরিফকে ফাঁসিয়েছে, তার বেশ কিছু প্রমাণ পুলিশ পেয়েছে। আজই আরিফের জামিনের শুনানি আছে। আমি কোর্টে যাব।

মায়া: (এগিয়ে এসে) বড় ভাইয়া, আমি আজ থেকে দুটো টিউশনি শুরু করেছি। আর বসে থাকা যাবে না। তোমার কাঁধের বোঝা আমি কিছুটা হলেও হালকা করতে চাই।

আসিফ: (আবেগপ্লুত হয়ে মায়ার মাথায় হাত বুলায়) তুই আমার লক্ষ্মী বোন রে। তোরা পাশে থাকলে আমি পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে পারি।

(দৃশ্য ২: আদালত প্রাঙ্গণ - দুপুর)

আদালতের বাইরে আসিফ আর তাদের আইনজীবী দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ আরিফকে হাতকড়া পরিয়ে গাড়ি থেকে নামায়। আরিফের চেহারা মলিন, দাড়ি গালভর্তি, অহংকারের সেই লেশমাত্র নেই। আসিফকে দেখেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

আরিফ: (কাঁদতে কাঁদতে) ভাইয়া! সুমি আজ সকালে ওর উকিল দিয়ে ডিভোর্সের পেপার পাঠিয়েছে। ও আমার সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিল! আমি সত্যিই একা হয়ে গেলাম ভাইয়া।

আসিফ: (আরিফের হাত চেপে ধরে) তুই একা নোস আরিফ। যে সুমি তোর সুসময়ের সঙ্গী ছিল, সে তোকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু যে ভাইয়ার সাথে তুই অন্যায় করেছিলি, সে তোকে কখনো ছাড়বে নেই। তুই ভেতরে চল, আজই তোর জামিন হবে।

(আদালতের ভেতরে আইনজীবী প্রমাণ করেন যে আরিফ মূলত সায়মনের মূল চক্রান্তের শিকার এবং সে নিজে কোনো টাকা আত্মসাৎ করেনি। বিচারক আরিফের জামিন মঞ্জুর করেন, তবে শর্ত থাকে যে ব্যাংকের টাকা উদ্ধারে তাকে পুলিশকে সাহায্য করতে হবে।)

(দৃশ্য ৩: কুরিয়ার সার্ভিসের হেড অফিস - বিকেল)

আসিফ জামিনের কাগজ নিয়ে আরিফকে সাথে করে তার অফিসে আসে। সে বিগত কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো ডিউটি করতে পারেনি, তাই তার মনে ভয় ছিল চাকরিটা বুঝি চলেই গেল। এমন সময় অফিসের ম্যানেজার আসিফকে বসের রুমে ডাকেন।

ম্যানেজার: আসিফ সাহেব, আমাদের এমডি স্যার আপনাকে ডেকেছেন।

আসিফ: (ভীতু পায়ে ভেতরে ঢুকে) স্যার, গত দুদিন আমি পারিবারিক ঝামেলার কারণে ঠিকমতো পার্সেল ডেলিভারি দিতে পারিনি। প্লিজ আমার চাকরিটা...

এমডি স্যার: (হাসিমুখে চেয়ার থেকে উঠে এসে আসিফের হাত ধরেন) আরে আসিফ সাহেব! বসুন। আপনি ভাবছেন আপনার চাকরি চলে গেছে? একদমই না। আমাদের কুরিয়ার সার্ভিসের ইতিহাসে আপনার মতো সৎ, শিক্ষিত এবং ডেডিকেটেড ছেলে আমরা খুব কম দেখেছি। আপনি এমএ পাস করে যে নিষ্ঠার সাথে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন, তা প্রশংসনীয়।

আসিফ: (অবাক হয়ে) স্যার... মানে?

এমডি স্যার: আমাদের ঢাকা জোনের 'লজিস্টিকস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন এরিয়া ম্যানেজার' পদটি খালি হয়েছে। আমরা আপনার সততা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করে আপনাকে এই পদে প্রমোট করছি। আজ থেকেই আপনার জয়েনিং। এখন থেকে আর আপনাকে রাস্তায় ঘুরতে হবে না, আপনি পুরো জোনের সাপ্লাই চেইন কন্ট্রোল করবেন! আর আপনার বেতনও আগের চেয়ে তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হলো।

(অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে আরিফ দরজার ফাঁক দিয়ে সব শুনছিল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সুমি পাত্রপক্ষের কাছে আসিফকে নিয়ে যে মিথ্যা অহংকার করেছিল, আজ সততার জোরে আসিফ সত্যি সত্যিই সেই সম্মানের পদে আসীন হলো।)

(দৃশ্য ৪: টিনের বাড়ির উঠোন - সন্ধ্যা)

আসিফ আর আরিফ একসাথে বাড়িতে ফেরে। আরিফকে দেখে ফাতেমা বেগম আর মায়া ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। আরিফ সবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।

আরিফ: আম্মা, মায়া... আমাকে তোমরা মাফ করে দাও। আমি সুমির কথায় অন্ধ হয়ে এই পরিবারের রোদটুকু কেড়ে নিয়েছিলাম। আজ আসিফ ভাইয়া যদি না থাকত, আমি হয়তো জেলেই পচে মরতাম।

মায়া: (আরিফকে টেনে তুলে) ধুর পাগল! তুই তো আমাদের ছোট ভাই। একটু ভুল করেছিলি, তাই বলে কি মেজ ভাইয়াকে আমরা পর করে দিতে পারি?

আসিফ: (আরিফের কাঁধে হাত রেখে) এবার আমাদের নতুন করে লড়াই শুরু করতে হবে আরিফ। সায়মনকে পুলিশ খুব দ্রুতই ধরবে। আর আমি যে নতুন চাকরিটা পেয়েছি, তার টাকা আর তোর জমানো টাকা দিয়ে আমরা ব্যাংকের লোন আস্তে আস্তে শোধ করে দেব। আমাদের 'রোদ-ছায়ার উঠোন' আবার আগের মতো হাসিতে ভরে উঠবে।

(দৃশ্য ৫: হাসপাতালের কেবিন - রাত)

রাশেদ সাহেবকে আইসিইউ থেকে সাধারণ কেবিনে দেওয়া হয়েছে। ওনার জ্ঞান ফিরেছে। পুরো পরিবার ওনার বিছানার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওনার মুখে অক্সিজেনের মাস্ক খোলা। রাশেদ সাহেব আসিফের দিকে তাকালেন।

রাশেদ সাহেব: (দুর্বল কণ্ঠে, চোখে জল) আসিফ... আমি তোকে চিনতে ভুল করেছিলাম বাবা। আমি ভেবেছিলাম তুই ঘরে বসে আমাদের ওপর বোঝা হয়ে আছিস। কিন্তু তুই-ই আজ আমার পুরো পরিবারকে রাস্তায় নামা থেকে বাঁচালি। তুই আমার শ্রেষ্ঠ সন্তান।

আসিফ: (বাবার হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে) বাবা, সন্তানের কাছে মা-বাবার সম্মান আর পরিবারের চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না। আপনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুন, আমাদের নতুন টিনের বাড়িটা ছোট হতে পারে, কিন্তু সেখানে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।

(পুরো পরিবার একসাথে হাত মিলিয়ে হাসিমুখে দাঁড়ায়। পেছনের জানলা দিয়ে আকাশের চাঁদের আলো এসে তাদের ওপর পড়ে, যেন এক বুক ভরা শান্তির রোদ্দুর নেমে এসেছে তাদের জীবনে।)

​🎨 [সমাপ্তি]

নাটকের শেষ বার্তা: ধন-সম্পদ, অহংকার আর হিংসা মানুষকে সাময়িক সুখ দিতে পারে, কিন্তু জীবনের আসল রোদ লুকিয়ে থাকে পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ, সততা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মায়ার বাঁধনে।

Saturday, 1 August 2026

বেহিসেবী বউ


নাটকের নাম: বেহিসেবি বউ ধরন: পারিবারিক কমেডি ও সচেতনতামূলক সময়কাল: ১ ঘণ্টা (অন-স্ক্রিন সময়) প্রধান চরিত্রসমূহ: ১. আরিফ (৩২): মধ্যবিত্ত পরিবারের সংসারী ও হিসেবি ছেলে। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করে। ২. নীলা (২৫): আরিফের স্ত্রী। প্রচণ্ড শৌখিন, ট্রেন্ড-প্রেমী এবং মারাত্মক ‘বেহিসেবি’। ৩. আমেনা বেগম (৫৫): আরিফের মা। পরহেজগার এবং পুরোনো আমলের মিতব্যয়ী নারী। ৪. রতন (২২): আরিফের ছোট ভাই। কিছুটা ফচকে এবং ভাবির অন্যায় খরচের গোপন পার্টনার। ​দৃশ্য ১: বসার ঘর (সকাল) ​(বসার ঘরের টেবিলজুড়ে অনলাইনের শপিং ডেলিভারির প্যাকেট ছড়ানো। নীলা একের পর এক প্যাকেট খুলছে। পাশেই আরিফ কপালে হাত দিয়ে বসে আছে। আমেনা বেগম জায়নামাজ গুটিয়ে ঢুকছেন।) ​আরিফ: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) নীলা, এই নিয়ে চলতি মাসে তোমার ১৭ নম্বর পার্সেল আসলো। আলমারিতে জায়গা নেই, খাটের নিচে জায়গা নেই। এবার কি আমি বারান্দায় ঘুমাবো? ​নীলা: (একটি জমকালো শাড়ি বের করতে করতে) আহা আরিফ, বোঝো না কেন? এটা ‘লাইভ সেল’-এ অফারে পেয়েছি। অরিজিনাল দাম ৫০০০ টাকা, আমি পেয়েছি মাত্র ৪৩৯৯ টাকায়! পুরো ৬০১ টাকা সেভ করেছি! ​আরিফ: (হিসেব করে) কিন্তু এই শাড়িটা কি তোমার খুব দরকার ছিল? ​নীলা: দরকার মানে? আগামী মাসে আমার খালাতো বোনের ননদের বিয়ে। সেখানে কি আমি খালি গায়ে যাবো? ​আমেনা বেগম: (এগিয়ে এসে) বউমা, ছয় মাস আগেও একটা দামি শাড়ি কিনলে। ওটা তো একবারের বেশি পরোনি। একটু হাত গুটিয়ে খরচ করো মা, আরিফ একা কামায়। ​নীলা: আম্মা, আপনারা তো যুগের ট্রেন্ড বোঝেন না। এক শাড়ি পরে দুবার ছবি তুললে ফেসবুকের ফ্রেন্ডরা হাসাহাসি করবে। ​(এমন সময় রতন ঘরে ঢোকে হাতে আরও একটি বড় বক্স নিয়ে) ​রতন: ভাবি! তোমার আরও একটা পার্সেল এসেছে। ক্যাশ অন ডেলিভারি, ৩২০০ টাকা। ​আরিফ: (লাফিয়ে উঠে) কী! আবার? এবার কী এনেছ? ​নীলা: (খুশি হয়ে) একটা অটোমেটিক সবজি কাটার মেশিন। হাত দিতে হবে না, আলু-পটল দিলেই কুচি কুচি হয়ে যাবে। ​আরিফ: (মাথায় হাত দিয়ে) আমাদের বাসায় গত তিন বছর ধরে একটা ইলেকট্রিক চপার পড়ে আছে, যেটা তুমি আজ পর্যন্ত খোলোনি। রতন, ফেরত দাও এটা! ​নীলা: (মুখ হাঁড়ি করে) খবরদার রতন, ফেরত দেবে না। আরিফ, তুমি আসলে একটা কিপটে! মানুষের স্বামীরা বউকে কত কী দেয়, আর আমি একটা সামান্য সবজি কাটার মেশিন কিনলেই দোষ! ​(নীলা রাগ করে পার্সেল নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যায়।) ​দৃশ্য ২: আরিফের বেডরুম (রাত) ​(আরিফ ল্যাপটপে মাসের হিসাব করছে। নীলা মোবাইলে স্ক্রল করছে আর হাসছে।) ​আরিফ: নীলা, এ মাসে আমার বেতনের টাকা শেষ। ক্রেডিট কার্ডের বিল এসেছে ৪০ হাজার টাকা। অথচ আজ মাত্র ১৫ তারিখ। বাকি অর্ধেক মাস আমরা চলবো কীভাবে? ​নীলা: ওহ আরিফ, তুমি এত চিন্তা করো কেন? আল্লাহ্ রিজিক দাতা। তাছাড়া, আমার বান্ধবীরা সবাই মালদ্বীপ যাচ্ছে। আমরা অন্তত কক্সবাজার তো যেতেই পারি, তাই না? ​আরিফ: কক্সবাজার? ক্রেডিট কার্ডের মিনিমাম ডিউ দেওয়ার টাকা নেই আমার কাছে! নীলা, একটু বোঝো। মধ্যবিত্তের সংসার এভাবে চলে না। সঞ্চয় না থাকলে বিপদে পড়লে কেউ এগিয়ে আসবে না। ​নীলা: (বিরক্ত হয়ে) রাখো তোমার মধ্যবিত্তের ঘ্যানঘ্যান। আমি ঘুমালাম। ​দৃশ্য ৩: রান্নাঘর ও বসার ঘর (দুপুর - এক সপ্তাহ পর) ​(বাসায় এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। ড্রয়ার, আলমারি সব ফাঁকা। আমেনা বেগম রান্নাঘরে চালের ড্রাম উপুড় করে দেখছেন চাল নেই।) ​আমেনা বেগম: আরিফ, ঘরে তো চাল-ডাল কিচ্ছু নেই রে বাবা। আজ কী রান্না করবো? ​আরিফ: (হতাশ গলায়) মা, আমার পকেটে মাত্র ২০০ টাকা আছে। ক্রেডিট কার্ডও ব্লক হয়ে গেছে অতিরিক্ত খরচের কারণে। বন্ধুদের কাছেও ধার চেয়ে পাইনি। ​নীলা: (ড্রয়িংরুমে এসে) আরিফ, আমার অনলাইন থেকে অর্ডার করা এক জোড়া জুতো এসেছে। ১২০০ টাকা দাও তো। ​আরিফ: (এবার রেগে চিৎকার করে) টাকা নেই নীলা! কোনো টাকা নেই! ঘরে চাল কেনার টাকা নেই, আর তুমি জুতোর জন্য টাকা চাচ্ছো? এই নাও আমার মানিব্যাগ, দেখো কী আছে এতে! ​(আরিফ মানিব্যাগটা ছুড়ে দেয়। সত্যি সত্যিই তাতে মাত্র একটা একশ টাকার নোট আর কিছু কয়েন। নীলা হতভম্ব হয়ে যায়।) ​নীলা: সত্যি... সত্যি টাকা নেই? কিন্তু তোমার তো এত টাকা বেতন! ​আরিফ: বেতন ৩০ তারিখে হয় নীলা, আর তোমার শপিংয়ের কারণে সেটা ৫ তারিখেই শেষ হয়ে যায়। আজ থেকে এই সংসারে আর কোনো বাড়তি খরচ হবে না। রতন, জুতো ফেরত দিয়ে দাও। ​দৃশ্য ৪: একটি আকস্মিক বিপদ (কয়েকদিন পর) ​(আমেনা বেগম হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে বসার ঘরের সোফায় ঢলে পড়েন। রতন চিৎকার করে ওঠে।) ​রতন: ভাইয়া! ভাবি! জলদি এসো। আম্মা কেমন করছেন! ​(আরিফ ও নীলা ছুটে আসে। আমেনা বেগম অসুস্থ।) ​আরিফ: (আতঙ্কিত) হার্টের সমস্যা! জলদি হাসপাতালে নিতে হবে। রতন, অ্যাম্বুলেন্স ডাক। ​(হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ডাক্তার জানান, আমেনা বেগমকে ভর্তি করতে হবে এবং জরুরি কিছু টেস্টের জন্য এখনই ২০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে।) ​হাসপাতালের কাউন্টার: স্যার, আগে ২০ হাজার টাকা ক্যাশ জমা দিন, তারপর ফাইল প্রসেস হবে। ​আরিফ: (কেঁদে ফেলে) ভাই, আমার কাছে এই মুহূর্তে কোনো টাকা নেই। আমার ক্রেডিট কার্ডও কাজ করছে না। প্লিজ, আমার মায়ের চিকিৎসা শুরু করুন, আমি দুপুরের মধ্যে টাকা জোগাড় করছি। ​কাউন্টার: দুঃখিত স্যার, হাসপাতালের নিয়ম। ​(আরিফ দেয়ালে মাথা ঠুকে কাঁদতে থাকে। সে একের পর এক আত্মীয়কে ফোন করছে, কিন্তু কেউ এত দ্রুত টাকা দিতে পারছে না। নীলা এক কোণায় দাঁড়িয়ে দেখছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার দামি দামি শাড়ি, জুতো আর কসমেটিকসের প্যাকেটগুলো। সে বুঝতে পারে, তার এই বেহিসেবি খরচের কারণেই আজ তার শাশুড়ি মৃত্যুর মুখে, অথচ স্বামীর হাতে এক টাকাও নেই।) ​দৃশ্য ৫: নীলার উপলব্ধি ও পরিবর্তন ​(নীলা দৌড়ে হাসপাতালের বাইরে যায়। কিছুক্ষণ পর সে ফিরে আসে। তার হাতে ২০ হাজার টাকা। সে কাউন্টারে টাকাটা জমা দেয়।) ​আরিফ: (অবাক হয়ে) নীলা! তুমি এত টাকা কোথায় পেলে? ​নীলা: (চোখের জল মুছে) আমার বিয়ের সোনার চুড়ি দুটো পাশের জুয়েলারির দোকানে বন্ধক রেখে এসেছি আরিফ। ​আরিফ: (স্তব্ধ হয়ে যায়) নীলা... তোমার শখের চুড়ি... ​নীলা: (আরিফের হাত ধরে) আমাকে মাফ করে দাও আরিফ। আজ যদি আমার জমানো কিছু টাকা থাকতো, তবে আমার বিয়ের গয়না হাতছাড়া হতো না। আম্মার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী। আমি বুঝতে পেরেছি, সঞ্চয় কতটা জরুরি। শখ পূরণের চেয়ে জীবনের নিরাপত্তা অনেক বড়। ​দৃশ্য ৬: বসার ঘর (ছয় মাস পর - সমাপ্তি) ​(আমেনা বেগম সুস্থ হয়ে সোফায় বসে আছেন। আরিফ অফিস থেকে ফিরেছে। রতন ড্রয়িংরুমে বসে পড়ছে। নীলা হাতে একটা ডায়েরি নিয়ে হিসাব করছে।) ​নীলা: আরিফ, এই নাও এ মাসের খরচের হিসাব। বাজার খরচ, ইউটিলিটি বিল আর আম্মার ওষুধের পর এবার আমাদের ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় হয়েছে। ​আরিফ: (হেসে) বাহ্! আমার বেহিসেবি বউ তো এখন পাকা অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়ে গেছে! ​রতন: শুধু কি তাই ভাইয়া? ভাবি এখন অনলাইনে ‘মিতব্যয়ী সংসার’ নামে একটা পেজ খুলেছে, যেখানে উনি নারীদের শেখাচ্ছেন কীভাবে টাকা জমাতে হয়! ​আমেনা বেগম: (হেসে) আমার বউমা তো ঘরের লক্ষ্মী। বিপদে যে বুদ্ধি খাটায়, সেই তো আসল ঘরণী। ​নীলা: (আরিফের দিকে তাকিয়ে) আর কোনো বেহিসেব নয়। কারণ, হিসাবের সংসারেই আসল সুখ। ​(সবাই হাসে। স্ক্রিন ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসে।) ​--- সমাপ্ত ---

Wednesday, 1 July 2026

নাটক👉 মোহভঙ্গ। রচনাঃকিশোর দুলাল রায়


নাটকঃ মোহভঙ্গ 
রচনাঃ কিশোর দুলাল রায় 

চরিত্রসমূহ:

১. আসলাম (৩৫): বড় ভাই। সরকারি বা কর্পোরেট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। একটু অহংকারী, তবে স্ত্রীর কথায় ওঠাবসা করে।

২. সুলতানা (৩০): বড় ভাইয়ের বউ। অহংকারী, লোভী এবং সংসারের সব অশান্তির মূল।

৩. আরিফ (২৮): ছোট ভাই। সৎ, শান্ত এবং অল্প আয়ের চাকরি বা ফ্রিল্যান্সিং করে।

৪. মিতু (২৩): ছোট ভাইয়ের বউ। ধৈর্যশীল, পরোপকারী ও বাস্তববাদী।

৫. মা (৬০): দুই ভাইয়ের বৃদ্ধ মা (প্রয়োজনে রাখা হয়েছে গভীরতা তৈরির জন্য)।

​দৃশ্য ১

স্থান: ড্রয়িং রুম ও ডাইনিং টেবিল।

সময়: সকাল।

(টেবিলে নাস্তা সাজানো। সুলতানা দামি শাড়ি পরে বসে আছে। মিতু রান্নাঘর থেকে চা আর রুটি নিয়ে আসছে। আসলাম ডাইনিং টেবিলে বসে মোবাইল দেখছে। আরিফ তাড়াহুড়ো করে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে।)

সুলতানা: (চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মুখ বাঁকিয়ে) মিতু, চায়ের চিনিটা আজকেও কম হয়েছে। কতবার বলব, একটু রয়েসয়ে কাজ করবে? নাকি আমাদের টাকায় চিনি কেনা হয় বলে ইচ্ছে করে নষ্ট করছ?

মিতু: (নম্রভাবে) না আপা, ভাইয়ার ডায়াবেটিসের কথা চিন্তা করে চিনিটা একটু কম দিয়েছি। আপনার কাপে আলাদা চিনি দেব?

সুলতানা: লাগবে না। বাহানার তো শেষ নেই। নিজেরা তো সংসারে একটা টাকাও দিতে পারো না, শুধু বড় ভাইয়ের ঘাড়ে বসে খাওয়া!

আরিফ: (জুতো পরতে পরতে) ভাবি, আমি কিন্তু প্রতি মাসে আমার সাধ্যমতো বাজারের টাকা দিই। হ্যাঁ, ভাইয়ার মতো অত দিতে পারি না, তবে একদম দিই না—এটা বলা ভুল।

আসলাম: (ভাব নিয়ে) থাক আরিফ, তর্ক করো না। তোমার ভাবি ভুল কিছু বলেনি। এই যে ফ্ল্যাটের ভাড়া, এসি, কারেন্ট বিল—সব তো একাই আমাকে টানতে হয়। তোমার ওই সামান্য ১০-১৫ হাজার টাকার চাকরিতে কি আর সংসার চলে?

মিতু: ভাইয়া, আমরা তো আলাদা হতে চেয়েছিলাম। আপনারাই তো বললেন একসাথে থাকতে।

সুলতানা: ওহ, এখন আবার আমাদের দোষ? আলাদা থাকার মুরোদ আছে নাকি তোমাদের? এই শহরে বাড়ি ভাড়া দিয়ে তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পারতে না! আসলাম, তুমি এদের বেশি মাথায় তুলছ।

আসলাম: বাজারটা আজ একটু ভালো করে করো আরিফ। আমার ক্লায়েন্ট আসবে রাতে। আর সুলতানা, তোমার জন্য ওই গয়নাটা আজই বুকিং দিয়ে দেব।

সুলতানা: (খুশি হয়ে) থ্যাংক ইউ জান! শুনলে তো মিতু? একেই বলে পুরুষ মানুষ। কামাই করতে জানতে হয়।

(আরিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিতুর দিকে তাকায়। মিতু ইশারায় শান্ত হতে বলে। আরিফ বেরিয়ে যায়।)

​দৃশ্য ২

স্থান: আরিফ ও মিতুর বেডরুম।

সময়: রাত।

(আরিফ ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে আছে। মিতু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।)

আরিফ: মিতু, মাঝে মাঝে নিজেকে খুব ব্যর্থ মনে হয়। বড় ভাবির ওই কথাগুলো আর সহ্য হয় না। ভাইয়াও কেমন যেন বদলে গেছে। টাকার গরমে অন্ধ।

মিতু: তুমি মন খারাপ করো না। মানুষের দিন সবসময় একরকম যায় না। তুমি তো সততার সাথে চেষ্টা করছ। ভাইয়ার চাকরিটা বড়, কিন্তু আমার কেন যেন ইদানীং ভয় করে।

আরিফ: কেন, কী হয়েছে?

মিতু: ভাইয়া ইদানীং বাসায় অনেক ক্যাশ টাকা নিয়ে আসে। সেদিন আলমারিতে দেখলাম লাখ লাখ টাকা। একজন সৎ চাকরিজীবীর কাছে এত নগদ টাকা থাকার কথা নয়।

আরিফ: আমি ভাইয়াকে বুঝিয়েছিলাম। কিন্তু ভাইয়া উল্টো আমাকে ধমক দিয়ে বলেছে—"আগে টাকা কামাতে শেখ, তারপর জ্ঞান দিবি।" স্রষ্টা সবাইকে হেদায়েত করুন।

​দৃশ্য ৩

স্থান: আসলামের ড্রয়িং রুম।

সময়: বিকেল (কয়েক মাস পর)।

(ড্রয়িং রুমে আসলাম ও সুলতানা বসে আছে। সুলতানার হাতে বেশ কিছু নতুন শপিং ব্যাগ। সে খুব উৎফুল্ল।)

সুলতানা: এই দেখো আসলাম, আজ এই ডায়মন্ডের নেকলেসটা কিনলাম। ভাবি দেখলেই একদম হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরবে।

আসলাম: (একটু চিন্তিত, মোবাইলে বারবার কল দেখছে) হুম, ভালো। তবে সুলতানা, ইদানীং অফিস থেকে একটু চাপ আসছে। অডিটর বসেছে।

সুলতানা: ধুর! ওসব অডিট-ফডিট প্রতি বছরই আসে। তুমি তো ম্যানেজ করতে জানোই। আচ্ছা, মিতুকে দিয়ে এক কাপ কফি পাওয়া যাবে? ওর আবার শরীর খারাপ নাকি, ঘরে বসে আছে।

(ঠিক এই সময় দরজার বেল বেজে ওঠে। মিতু দরজা খোলে। হুড়মুড় করে সিভিল ড্রেসে চার-পাঁচজন পুলিশ এবং আসলামের অফিসের ডিরেক্টর ভেতরে ঢোকেন।)

অফিসার: আসলাম সাহেব কে?

আসলাম: (কেঁপে উঠে) হ্যাঁ, আমি। কী ব্যাপার?

ডিরেক্টর: আসলাম সাহেব, আপনার বিরুদ্ধে অফিসের ৫০ লাখ টাকা তছরুপ এবং ঘুষ নেওয়ার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। ম্যানেজমেন্ট আপনাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে এবং পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সুলতানা: (চিৎকার করে) কী বলছেন এসব! ভুল হচ্ছে কোথাও! আমার স্বামী এমন করতেই পারে না!

অফিসার: আমাদের কাছে ওয়ারেন্ট আছে। আসলাম সাহেব, চলুন।

(পুলিশ আসলামকে হাতকড়া পরায়। আসলাম মাথা নিচু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সুলতানা সোফায় বসে পড়ে কাঁদতে থাকে। মিতু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।)

​দৃশ্য ৪

স্থান: ড্রয়িং রুম (আসলামের গ্রেফতারের এক মাস পর)।

সময়: দুপুর।

(ঘরটা এখন ফাঁকা ও নিস্তব্ধ। দামি সোফা বা শোপিসগুলো নেই, ঋণ শোধ করতে বিক্রি করা হয়েছে। সুলতানা সাধারণ একটা সুতি শাড়ি পরে মুখ কালো করে বসে আছে। মিতু ঘর গুছাচ্ছে।)

সুলতানা: (কান্নাজড়িত কণ্ঠে) আমার কপালটাই পুড়ল। আসলামের জামিনও হচ্ছে না, জমানো সব টাকা উকিল আর দেনা শোধ করতেই শেষ। এই ফ্ল্যাটের ভাড়াই বা কে দেবে? আমাদের তো না খেয়ে রাস্তায় বসতে হবে!

মিতু: (সুলতানার পাশে এসে মাথায় হাত রাখে) ভাবি, ভেঙে পড়বেন না। আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। ভাইয়ার এই শাস্তিটা হয়তো উনাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে। আর আমরা তো রাস্তায় বসিনি, আমরা আছি তো।

সুলতানা: (মুখ সরিয়ে নিয়ে) তোমরা? আরিফের ওই সামান্য টাকায় এই সংসার চলবে? এখন তো তোমরা আমাদের তাড়িয়ে দেবে, আমি জানি। আমি তোমার সাথে যা ব্যবহার করেছি...

মিতু: আমরা তেমন মানুষ নই ভাবি। বিপদে পরিবারই তো পরিবারের পাশে দাঁড়ায়।

​দৃশ্য ৫

স্থান: ডাইনিং টেবিল।

সময়: রাত।

(টেবিলে খুব সাধারণ ডাল, ভাত আর সবজি। আরিফ অফিস থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসে। মিতু খাবার বেড়ে দিচ্ছে। সুলতানা অপরাধীর মতো এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে।)

আরিফ: ভাবি, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন, একসাথে খাই।

সুলতানা: না আরিফ, তোমরা খাও। আমার ক্ষুধা নেই।

আরিফ: শুনুন ভাবি। অতীত ভুলে যান। ভাইয়া অন্যায় করেছিল, তার শাস্তি হচ্ছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমাদের সংসার ভেঙে যাবে। আমি এই এক মাসে আমার চাকরিতে প্রমোশন পেয়েছি, পাশাপাশি একটা পার্ট-টাইম প্রজেক্টের কাজ পেয়েছি। এখন থেকে সংসারের দায়িত্ব আমার।

সুলতানা: (চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে) আমাকে মাফ করে দাও আরিফ। আমি টাকার গরমে অন্ধ হয়ে তোমাদের কত অপমান করেছি। আর আজকে আমার এই বিপদে তোমরাই আমাকে আগলে রাখলে!

আরিফ: আপনি আমার বড় ভাবি, মায়ের মতো। আর মিতু, তুমি কালকেই এই ফ্ল্যাট ছেড়ে আমাদের বাজেটের মধ্যে একটা ছোট কিন্তু সুন্দর ফ্ল্যাট দেখে রাখবে। আমরা নতুন করে শুরু করব।

মিতু: (হেসে) আমি আজকেই একটা ফ্ল্যাট দেখে এসেছি। ঘরটা ছোট, কিন্তু আমাদের সবার মনটা বড় হলে ওখানেই অনেক সুখ হবে।

(সুলতানা মিতুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আরিফ মিতুর দিকে তাকিয়ে হাসে। একটা সুন্দর পারিবারিক আবহের মধ্য দিয়ে নাটকটি শেষ হয়।)

...সমাপ্ত...

নাটকঃ সংসার। রচনাঃকিশোর দুলাল রায়

নাটকের নাম: সংসার

রচনাঃ কিশোর দুলাল রায় 

চরিত্রসমূহ:

১. রহমান সাহেব (৬০): অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরিজীবী। পরিবারের বটগাছ।

২. রাবেয়া বেগম (৫৫): রহমানের স্ত্রী। সংসারী, কিছুটা অভিমানী কিন্তু মমতাময়ী।

৩. আসিফ (২৮): বড় ছেলে। কর্পোরেট চাকরি করে, সারাক্ষণ ব্যস্ত ও মানসিক চাপে থাকে।

৪. মিতু (২৪): আসিফের স্ত্রী। আধুনিক কিন্তু দায়িত্বশীল।

৫. আকাশ (২২): ছোট ছেলে। ভার্সিটিতে পড়ে, কিছুটা চঞ্চল ও আবেগপ্রবণ।

দৃশ্য ১: সকালের চায়ের টেবিল (হাসি ও খুনসুটি)

সময়: সকাল ৮:০০ টা।

স্থান: ড্রয়িং কাম ডাইনিং রুম।

(মঞ্চ বা স্ক্রিন ওপেন হতেই দেখা যাবে রাবেয়া বেগম টেবিলে নাস্তা রাখছেন। রহমান সাহেব চশমা নাকে দিয়ে পত্রিকা পড়ছেন। আকাশ এসে ডাইনিং চেয়ারে ধপ করে বসল।)

আকাশ: মা! ও মা! জলদি খেতে দাও। আজকে ভার্সিটিতে প্রেজেন্টেশন আছে। লেট হলে স্যার কুচকুচ করে নাম্বার কেটে দেবে!

রাবেয়া: (রান্নাঘর থেকে আসতে আসতে) চিল্লাসনে তো সকাল সকাল। এই নে তোর ডিম পোচ আর পরোটা। তোর বড় ভাইয়া আর বৌমা কই?

আকাশ: ভাইয়া তো ওয়াশরুমে বসেও মনে হয় ল্যাপটপে টাইপ করে। আর ভাবি বোধহয় সাজগোজ করছে।

রহমান: (পত্রিকা থেকে চোখ সরিয়ে) আকাশ, বড়দের নিয়ে ওভাবে কথা বলতে নেই। আর তোর পড়াশোনার কী খবর? খালি তো দেখি গিটার নিয়ে টুংটাং করিস।

আকাশ: আব্বা, মিউজিক হলো আত্মার খোরাক। তুমি বুঝবে না।

(এমন সময় আসিফ ফোনে কথা বলতে বলতে তাড়াহুড়ো করে ঢোকে। তার পেছনে মিতু পানির বোতল আর টিফিন বক্স নিয়ে আসে।)

আসিফ: (ফোনে) হ্যাঁ স্যার, আমি জ্যামে পড়ার আগেই পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। ফাইলটা রেডি। (ফোন রেখে) মা, আমি শুধু এক কাপ চা খাব। নাস্তা করার সময় নেই।

মিতু: আসিফ, খালি পেটে অফিসে গেলে আবার গ্যাস্ট্রিকের ব্যথায় চিল্লাবে। দুটো মুখে দাও।

আসিফ: (বিরক্ত হয়ে) মিতু, প্লিজ! চিল্লাই আমি? তুমি বুঝবে না আমার কাজের প্রেশার কত!

রাবেয়া: (ধমকের সুরে) আসিফ! মিতুর ওপর এভাবে ঝাড়ছিস কেন? ও তো তোর ভালোর জন্যই বলছে।

রহমান: থাক মা মিতু, ওকে জোর করো না। ও এখন বড় অফিসার, আমাদের কথার দাম ওর কাছে কম।

(আসিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চা না খেয়েই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়। মিতুর মুখটা কালো হয়ে যায়। আকাশ পরিস্থিতি হালকা করতে গান গেয়ে ওঠে— "সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে..."। রাবেয়া আকাশকে হালকা চড় মারে। সবাই হেসে ওঠে, কিন্তু মিতুর হাসির পেছনে একটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে থাকে।)

দৃশ্য ২: মধ্যরাত (অফিসের চাপ ও দূরত্ব)

সময়: রাত ১১:৩০ টা।

স্থান: আসিফ ও মিতুর বেডরুম।

(মিতু বিছানায় বসে বই পড়ছে। আসিফ রুমে ঢোকে। টাইটা আলগা করে বিছানায় ক্লান্ত হয়ে বসে।)

মিতু: ফ্রেশ হয়ে নাও, খাবার গরম করে আনছি।

আসিফ: ক্ষুধা নেই মিতু। ক্লায়েন্ট মিট ছিল, ওখানেই খেয়েছি।

মিতু: (বইটা বন্ধ করে) প্রতিদিন একই কথা। এই পরিবারে তোমার ভূমিকাটা ঠিক কী আসিফ? শুধু টাকা পাঠানো? বাবা-মা তোমার সাথে দুটো কথা বলার জন্য বসে থাকে। আর আমার সাথে তো তোমার কথাই হয় না।

আসিফ: (উত্তেজিত হয়ে) মিতু, আমি কি বাইরে গিয়ে মার্বেল খেলি? এই যে এত বড় ফ্ল্যাটের ইএমআই, বাবার ওষুধের খরচ, আকাশের সেমিস্টার ফি—এগুলো কোথা থেকে আসে? আমি রোবটের মতো খাটছি এই সংসারের জন্য!

মিতু: সবাই টাকা চায় না আসিফ, একটু সময় চায়। একটু মানসিক শান্তি চায়। তোমার এই রুক্ষ ব্যবহার একটা দিন এই সংসারটাকে ভেঙে দেবে।

আসিফ: ভেঙে দিলে দিক! আমি ক্লান্ত। প্রতিদিনের এই ঘ্যানঘ্যান আমার আর ভালো লাগে না!

(আসিফ বালিশ নিয়ে সোফায় গিয়ে শোয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মিতু বিছানায় মুখ লুকিয়ে কাঁদতে শুরু করে। পাশের ঘর থেকে রহমান সাহেব ও রাবেয়া বেগম এই ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পান। দুজনের মুখেই চরম উদ্বেগের ছাপ।)

দৃশ্য ৩: আকস্মিক ঝড় (বেদনা ও আবেগ)

সময়: দুপুর ২:০০ টা (কয়েকদিন পর)।

স্থান: ড্রয়িং রুম।

(হঠাৎ কলিং বেল জোরে বাজতে থাকে। আকাশ হন্তদন্ত হয়ে দরজা খোলে। দেখে মিতু কাঁদছে, তার হাত কাঁপছে।)

আকাশ: ভাবি! কী হয়েছে? তুমি কাঁদছ কেন?

মিতু: (কেঁদে ফেলে) আকাশ... আব্বা... আব্বা অফিসে যাওয়ার পথে হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে রাস্তায় পড়ে গেছেন। মানুষজন ওনাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে গেছে।

রাবেয়া: (ভেতর থেকে এসে চিৎকার করে ওঠেন) একী বলছিস তোরা! আমার কর্তার কী হয়েছে? ও আল্লাহ!

(পুরো পরিবারে স্তব্ধতা নেমে আসে। আকাশ তৎক্ষণাৎ আসিফকে ফোন দেয়।)

আকাশ: (ফোনে) ভাইয়া! জলদি ল্যাবএইড হসপিটালে আসো। আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে! সিসিইউতে নেওয়া হয়েছে।

[স্থান পরিবর্তন: হাসপাতালের করিডোর]

(সবাই করিডোরে অপেক্ষা করছে। রাবেয়া বেগম জায়নামাজে বসে কাঁদছেন। আসিফ ছুটে আসে। তার চুল উসকোখুসকো, চোখে জল।)

আসিফ: মা! আব্বা কেমন আছে? ডাক্তার কী বলল?

আকাশ: (রাগ ও ক্ষোভে) এখন এসে কী হবে ভাইয়া? আব্বা গত তিনদিন ধরে বুক ব্যথার কথা বলছিল। তুমি তো ল্যাপটপ থেকে চোখ সরানোর সময় পাওনি! আব্বা বলছিল, "আমার বড় ছেলেটা এত ব্যস্ত, ওরে ডিস্টার্ব করিস না।"

আসিফ: (স্তব্ধ হয়ে যায়) আব্বা... আব্বা এ কথা বলেছে?

মিতু: (এগিয়ে এসে) হ্যাঁ আসিফ। তুমি এই সংসারের জন্য টাকা রোজগার করেছ সত্যি, কিন্তু সংসারের মানুষগুলোর দিকে তাকানোর সময় তোমার ছিল না। আজ যদি বাবার কিছু হয়ে যায়, তুমি কি তোমার টাকা দিয়ে বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে?

(আসিফ হাসপাতালের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে, ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে সে কতটা একা হয়ে গেছে এবং তার আসল সম্পদকে অবহেলা করেছে।)

দৃশ্য ৪: পুনর্মিলন (সুখ ও উপলব্ধি)

সময়: তিন সপ্তাহ পর, বিকেল ৫:০০ টা।

স্থান: বাড়ির ছাদ বা বারান্দা (যেখানে গাছপালা আছে)।

(রহমান সাহেব এখন সুস্থ। তিনি একটা ইজি চেয়ারে বসে আছেন। রাবেয়া বেগম পাশে বসে ওনাকে ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। আকাশ কোণায় বসে গিটার টিউন করছে। মিতু চা নিয়ে আসে। আসিফ অফিস থেকে আজ অনেক তাড়াতাড়ি ফিরেছে। তার হাতে এক ঠোঙা জিলিপি আর বাবার প্রিয় বেলি ফুলের মালা।)

আসিফ: (বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে) আব্বা, আজকে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এলাম। আপনার পছন্দের গরম গরম জিলিপি এনেছি। আর মায়ের জন্য বেলি ফুল।

রাবেয়া: (মুচকি হেসে) সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছিল রে বাবা?

রহমান: (আসিফের হাতটা ধরে) তোকে আজ অনেকদিন পর শান্ত দেখাচ্ছে বাবা। অফিস থেকে ছুটি পেয়েছিস?

আসিফ: না আব্বা। বসকে বলে দিয়েছি—দিনের শেষে কাজটা আমার পেশা, কিন্তু আপনারা আমার প্রাণ। জীবনের ব্যালেন্সটা করতে বড্ড দেরি করে ফেলেছিলাম। মিতু, আমাকে মাফ করে দিও।

(মিতু চোখের কোণের জল মুছে হেসে ফেলে এবং আসিফের হাতে চায়ের কাপ দেয়। আকাশ গিটার বাজিয়ে আনন্দের সুর তোলে।)

রহমান: (সবার দিকে তাকিয়ে) সংসার মানে শুধু একটা ছাদের নিচে থাকা নয়। সংসার হলো একে অপরের সুখ-দুঃখে ভাগীদার হওয়া, একে অপরের ভুলগুলো ক্ষমা করে দেওয়া। আজ আমার সংসারটা সত্যি পূর্ণ হলো।

(সবাই একসাথে হাসিমুখে ফ্রেমবন্দি হয়। ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি আবেগঘন হালকা সুর বাজতে থাকে।)

-- সমাপ্ত --

নাটকঃ- হৃদয়ে হালকা বৃষ্টি_লেখকঃ কিশোর দুলাল রায়

হৃদয়ে হালকা বৃষ্টি

সময়সীমা: ৬০ মিনিট (১ ঘণ্টা)

চরিত্রসমূহ:

১. আকাশ (২৫): কর্পোরেট চাকরিজীবী। গোছানো, একটু গম্ভীর স্বভাবের হলেও মেঘলার পাগলামির ভীষণ ভক্ত।

২. মেঘলা (২২): ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। চটপটে, বাচাল, ইমোশনাল এবং অসম্ভব হাসিখুশি।

৩. শুভ (২৫): আকাশের বন্ধু। সমঝদার এবং দুজনের সম্পর্কের মাঝে অনুঘটক।

৪. ওয়েটার/রিকশাওয়ালা: পার্শ্বচরিত্র।

দৃশ্য ১: ক্যাফেটেরিয়া (সময়: ২০ মিনিট)

(প্রেক্ষাপট: বিকেল বেলা। ক্যাফের এক কোণে আকাশ বসে আছে। টেবিলে ল্যাপটপ খোলা, সে বারবার ঘড়ি দেখছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃদু ক্যাফে মিউজিক। মেঘলা হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল। তার চুল কিছুটা এলোমেলো।)

আকাশ: (ল্যাপটপ বন্ধ করতে করতে, গম্ভীর গলায়) বাহ! অবশেষে ম্যাডামের পায়ের ধুলো পড়ল! ঘড়ির কাঁটাটা কি তোমার চেনা-জানার বাইরে থাকে মেঘলা? বিকেল ৫টায় আসার কথা ছিল, এখন সন্ধ্যা ৬টা ২০! পুরো এক ঘণ্টা বিশ মিনিট লেট!

মেঘলা: (ধপ করে চেয়ারটায় বসে, ব্যাগটা টেবিলে রেখে হাফ ছাড়ল) উফ আকাশ! তুমি একটা আস্ত রোবট। তুমি দেখছ আমি ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট লেট করেছি। আর আমি ভাবছি, এই ব্যস্ত শহরে একটা ছেলে আমার জন্য ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট ধরে একাসনে বসে অপেক্ষা করছে! ভাবলেই হৃদয়ে কেমন হালকা বৃষ্টি নেমে যাচ্ছে! কী গভীর প্রেম!

আকাশ: (হাঁ করে তাকিয়ে) বাহ! চোরের মায়ের বড় গলা! এই ডায়লগ দিয়ে আর কতদিন চালাবে? তা এতক্ষণ কী করছিলে শুনি? আবার কোনো বিড়াল ছানাকে রাস্তা পার করাচ্ছিলে? নাকি ট্রাফিক জ্যাম?

মেঘলা: (একটু হেসে, চুলগুলো কানের পিছে গুজে) উঁহু, আজ জ্যামের দোহাই দেব না। সত্যি বলব? আসার সময় না... নিউ মার্কেটের মোড়ে একটা শাড়ি দেখছিলাম। হালকা নীল রঙের, জমিনটা ঠিক তোমার এই আকাশের মতো। ভাবছিলাম শাড়িটা পরে যখন তোমার সামনে আসব, তুমি নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করবে! ওটা দেখতে গিয়েই...

আকাশ: (মনে মনে খুশি হলেও মুখে রাগ দেখিয়ে) শাড়ি দেখতে গিয়ে এত দেরি? তা কিনেছ?

মেঘলা: (কাছে ঝুঁকে, ফিসফিস করে) না তো! পকেটে তো গড়ের মাঠ। ভাবলাম, রাগ ভাঙানোর জন্য আগে তোমাকে দেখাই, তারপর তোমার পকেট থেকেই... (মিষ্টি করে হাসল)।

আকাশ: (মাথা নেড়ে) বুঝেছি, আমার পকেটে আজ সত্যিই হালকা বৃষ্টি নয়, একেবারে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাবে!

(ওয়েটারকে ডেকে) ওয়েটার, একটা কোল্ড কফি, একটা ব্ল্যাক কফি আর দুটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিন তো জলদি।

মেঘলা: (অবাক হয়ে) তুমি ব্ল্যাক কফি খাবে কেন? তুমি তো তেতো জিনিস সহ্যই করতে পারো না!

আকাশ: কেন পারব না? তোমার এই যে রোজকার তেতো তেতো কথা আর লেট করার বাহানা যদি আমি বছরের পর বছর সহ্য করতে পারি, তবে ব্ল্যাক কফি তো সামান্য জলভাত!

মেঘলা: (মুখ বাঁকিয়ে) ও আচ্ছা! এতই যখন তেতো লাগে, তবে ঝাল-মিষ্টি কোনো মেয়ের কাছে গেলেই পারো। কে বারণ করেছে?

আকাশ: (একটু নরম সুরে, মেঘলার দিকে তাকিয়ে) চেষ্টা করেছিলাম তো। কিন্তু সমস্যা হলো, অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকালেই এই মেঘলা আকাশটার কথা মনে পড়ে যায়। আর তখন মনে হয়, ঝাল-মিষ্টির চেয়ে এই মেঘ-বৃষ্টির অত্যাচারটাই অনেক বেশি সুন্দর।

মেঘলা: (লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল, টেবিলের ওপর রাখা আকাশের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল) আচ্ছা খড়কুটো মশাই, রাগ কমেছে?

আকাশ: কফিটা আসুক, তারপর ভাবব। তবে একটা শর্ত আছে। বিলটা কিন্তু আজ তুমি দেবে!

মেঘলা: (চোখ কপালে তুলে) ওরে বাবা! প্রেমিকের এই কিপটে রূপ তো জানা ছিল না! ঠিক আছে, বিল আমিই দেব। কিন্তু আমার ব্যাগে তো শুধু ৫০০ টাকার একটা নোট আছে, বাকিটা তোমার পকেট থেকেই 'উধার' নেব!

(দুজনেই হেসে ওঠে। কফি আসে। তারা গল্প করতে করতে কফি খায়। আলো ধীরে ধীরে কমে আসে।)

দৃশ্য ২: রিকশায় খুনসুটি (সময়: ১৫ মিনিট)

(প্রেক্ষাপট: রাস্তা। সন্ধ্যা নেমেছে, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলছে। আকাশ আর মেঘলা একটা রিকশায় বসে আছে। রিকশা চলছে হুড ফেলা অবস্থায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা ট্রাফিকের শব্দ আর রোমান্টিক আবহ সঙ্গীত।)

মেঘলা: (আকাশের কাঁধে মাথা রেখে) আকাশ, আচ্ছা আমাদের যখন বিয়ে হবে, আমরা রোজ সন্ধ্যায় এভাবে রিকশায় ঘুরব তো?

আকাশ: (হেসে) রোজ সন্ধ্যায় ঘুরলে তো অফিস থেকে আমাকে বের করে দেবে। তখন রিকশার ভাড়ার টাকা কে দেবে? তুমি টিউশনি করে চালাবে?

মেঘলা: (আকাশের চিমটি কেটে) তুমি একটা আস্ত আন-রোমান্টিক মানুষ! এই সুন্দর মুহূর্তে কেউ চাকরির কথা বলে? আমি এত সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছি, আর তুমি সেটাকে লাথি মেরে ভেঙে দিলে!

আকাশ: আচ্ছা বাবা ভুল হয়েছে। রোমান্টিক স্বপ্ন দেখো। তা রিকশায় ঘোরার পর আর কী করবে তোমার স্বপ্নে?

মেঘলা: তারপর আমরা একটা ছোট বাড়ি ভাড়া করব। বারান্দায় থাকবে অনেকগুলো মানিপ্ল্যান্ট আর গোলাপ গাছ। প্রতিদিন সকালে তুমি যখন ঘুমে থাকবে, আমি গাছের পাতা থেকে জল নিয়ে তোমার মুখে ছিটিয়ে দেব!

আকাশ: (ভয় পাওয়ার ভংগি করে) ওরে বাবা! ওটা সকালের রোমান্স হবে না, ওটা হবে থ্রিলার সিনেমা! এমনিতেই সকালে আমার ঘুম ভাঙতে চায় না, তার ওপর ঠান্ডা জল!

মেঘলা: (অভিমান করে মুখ ফিরিয়ে) হুহ! তোমার সাথে কথাই বলব না। রিকশাওয়ালা মামা, রিকশা থামান, আমি নেমে যাব।

রিকশাওয়ালা: (পেছনে তাকিয়ে হেসে) আপা, নামবেন না। স্যারে তো আপনেরে ভালোবাসেই এইরকম ঠাট্টা করতাছে। আমাগো মামীও বিয়ার আগে এইরকম রাগ করত!

আকাশ: (হেসে ফেলে রিকশাওয়ালাকে) দেখছেন মামা? আপনার মামীও এমন এক ঘণ্টা লেট করত?

রিকশাওয়ালা: ওরে স্যার! হেয় তো আইতই না! তিন ঘণ্টা খাড় করায়া রাখত।

মেঘলা: (হেসে ফেলে আকাশের হাত জড়িয়ে ধরে) দেখেছ? আমি তো মাত্র এক ঘণ্টা বিশ মিনিট লেট করেছি। সেই তুলনায় আমি কত ভালো! এখন বলো, আমাকে একটা আইসক্রিম খাওয়াবে কি না?

আকাশ: (পকেটে হাত দিয়ে) মানিব্যাগের অবস্থা তো এমনিতেই করুণ, তার ওপর আবার আইসক্রিম! আচ্ছা চলো, আজ পকেট পুরো খালিই হোক।

দৃশ্য ৩: বন্ধুর এন্ট্রি ও ভুল বোঝাবুঝি (সময়: ১৫ মিনিট)

(প্রেক্ষাপট: একটি পার্ক বা রাস্তার ধারের ফুচকার দোকান। সেখানে আকাশের বন্ধু শুভর সাথে দেখা হয়। শুভ একটু রসিক টাইপের ছেলে।)

শুভ: (আকাশকে দেখে) আরে আকাশ! কী খবর? আর পাশে এটি কে? আমাদের ভাবী সাহেব নাকি?

আকাশ: (হেসে) হ্যাঁ রে। এই হলো মেঘলা। আর মেঘলা, এ হলো শুভ—আমার কলেজের বন্ধু আর পৃথিবীর এক নম্বর আড্ডাখোর।

মেঘলা: (নমস্কার/সালাম জানিয়ে) ভালো আছেন ভাইয়া? আকাশ আপনার কথা অনেক বলেছে।

শুভ: ভালো আছি ভাবী। তবে আকাশ নিশ্চয়ই আমার বদনাম করেছে? ও তো নিজেই একটা কিপটে। আচ্ছা ভাবী, ও কি আপনাকে এখনো সেই কলেজের পুরোনো ডায়লগটাই মারে? ওই যে—'তুমি আমার জীবনের প্রথম বৃষ্টি'?

মেঘলা: (কান খাড়া করে, আকাশের দিকে তাকিয়ে) মানে? কোন ডায়লগ? ও কি অন্য কাউকেও এই ডায়লগ দিত নাকি?

শুভ: (পরিস্থিতি গরম করার জন্য মজা করে) আরে ভাবী, আপনি জানেন না? কলেজে থাকতে ও এক মেয়েকে...

আকাশ: (শুভর মুখ চেপে ধরে) এই শুভ! একদম চুপ কর। ও সব কিছু না মেঘলা, ও বানিয়ে বলছে।

মেঘলা: (হাত সরিয়ে নিয়ে, গম্ভীর হয়ে) না আকাশ, শুদুধু ও কেন বলবে? শুভ ভাইয়া বলুন না, কে ছিল সে?

শুভ: (বুঝতে পেরে যে এবার রিয়াল ঝগড়া লেগে যাবে) আরে না ভাবী, আমি মজা করছিলাম। আকাশ তো কলেজে মেয়েদের দেখলেই পালাত। ও তো আস্ত একটা দেবদাস ছিল আপনার জন্য! আমি জাস্ট ওর একটু পা টানছিলাম।

মেঘলা: (অভিমানী গলায়) না, আমার আর ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে না। আকাশ, আমি বাড়ি যাব।

আকাশ: (শুভকে চোখ রাঙিয়ে) তোর জন্য আজ আমার কপালে শনি আছে! (মেঘলার দিকে তাকিয়ে) মেঘলা, শোনো... ও জাস্ট ইয়ার্কি করছিল।

মেঘলা: (হনহন করে হাঁটতে শুরু করে) কোনো কথা শুনব না। তোমরা ছেলেরা সব এক!

দৃশ্য ৪: ক্লাইম্যাক্স ও হৃদয়ে হালকা বৃষ্টি (সময়: ১০ মিনিট)

(প্রেক্ষাপট: মেঘলাদের বাড়ির গলি। আলো আঁধারি পরিবেশ। হঠাৎ করেই টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মেঘলা ছাতা ছাড়া হাঁটছে, পেছন পেছন আকাশ আসছে।)

আকাশ: (ছুটে এসে মেঘলার হাত ধরে) মেঘলা! দাঁড়াও। এভাবে না বুঝে রাগ করে চলে যাচ্ছ কেন? শুভ সত্যি ইয়ার্কি করছিল। আমার জীবনে তুমিই প্রথম, আর তুমিই শেষ। বিশ্বাস করো।

মেঘলা: (চোখে জল, বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যাচ্ছে) তুমি সবসময় আমার লেট করা নিয়ে রাগ দেখাও, আমি কিছু বলি? কিন্তু তুমি অন্য কারো সাথে আমাকে তুলনা করবে, ওটা আমি সহ্য করতে পারি না।

আকাশ: (মেঘলার দুই কাঁধ ধরে, খুব নরম গলায়) পাগলী একটা! এই আকাশে কি কখনো দুটো মেঘ একসাথে জমে? এই আকাশে তো শুধু একটাই মেঘলা আছে, যে সারাদিন শুধু বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। শুভ জাস্ট আমাদের একটু রাগাতে চেয়েছিল। আই অ্যাম স্যরি, বাবা। আর কখনো এমন মজা করতে দেব না কাউকে।

মেঘলা: (আকাশের বুকে আলতো করে কিল মেরে) তুমি বড্ড দুষ্টু! আর তোমার ওই বন্ধুটা আরও বেশি খ্যাপাটে। আমার সত্যি খুব ভয় পেয়েছিল, জানো?

আকাশ: (মেঘলার কপাল থেকে ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে) ভয়ের কিছু নেই। এই যে বৃষ্টি দেখছ? এই বৃষ্টিই আমাদের সাক্ষী।

মেঘলা: (হেসে ফেলে, বৃষ্টির দিকে হাত বাড়িয়ে) সত্যি আকাশ! রাগটা কমে যেতেই মনের ভেতরে কেমন যেন শান্তি লাগছে। একদম নাটকের নামের মতো... হৃদয়ে হালকা বৃষ্টি!

আকাশ: (পকেট থেকে সেই হালকা নীল শাড়িটা বের করে, যেটা সে মেঘলার অজান্তেই ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় কিনে নিয়েছিল) এই নাও। তোমার সেই 'আকাশ' রঙের শাড়ি।

মেঘলা: (অবাক হয়ে, খুশিতে চিৎকার করে) ওমা! এটা তুমি কখন কিনলে? তুমি তো ক্যাফেতে বসে বলছিলে পকেটে গড়ের মাঠ!

আকাশ: (হেসে) প্রেমিকার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এই আকাশ নিজের পকেট কেন, পুরো দুনিয়া খালি করে দিতে পারে। এবার জলদি বাড়ি যাও, নাহলে ঠান্ডা লেগে যাবে। কাল কিন্তু এই শাড়িটা পরেই আমার সামনে আসবে, মনে থাকে যেন!

মেঘলা: (শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরে, মিষ্টি হেসে) উম্ম... আচ্ছা, কাল ঠিক বিকেল ৫টায়। এক মিনিটও লেট করব না, প্রমিস!

আকাশ: (হেসে) দেখা যাবে!

(মেঘলা হাসতে হাসতে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। আকাশ বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মিষ্টি রোমান্টিক গান বেজে ওঠে এবং আলো আস্তে আস্তে নিভে আসে।)

-সমাপ্ত-

নাটকঃ বলবো বলবো করেও_লেখকঃ কিশোর দুলাল রায়

বলবো বলবো করেও.....
কিশোর দুলাল রায়

ধরন: রোমান্টিক, ড্রামা ও ফ্যামিলি কমেডি
প্রধান চরিত্র:
আকাশ (নায়ক): একটু অন্তর্মুখী, চাপা স্বভাবের কিন্তু ভীষণ কেয়ারিং। মুখে কিছু না বললেও কাজে-কর্মে তার ভালোবাসা প্রকাশ পায়।
বৃষ্টি (নায়িকা): চঞ্চল, মিষ্টি এবং দুষ্টু স্বভাবের। আকাশকে খেপাতে পছন্দ করে, কিন্তু তাকে ছাড়া এক মুহূর্তও চলতে পারে না।
​দৃশ্য ১: সকাল, গ্রামের চায়ের দোকান / রাস্তার মোড়
​(আকাশ একটা সাইকেলের চেইনে গ্রিজ লাগাচ্ছে। এমন সময় বৃষ্টি সেখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। দুজনের চোখাচোখি হয়, কিন্তু কেউ সরাসরি তাকাচ্ছে না। চোরের মতো একে অপরকে দেখছে।)
​আকাশ: (মনে মনে) আজ শাড়ি পরেছে কেন? এমনিতেই দেখতে ভালো লাগে, আজ তো আরও... না না, আকাশের দিকে তাকালে চলবে না, কাজে মন দাও।
বৃষ্টি: (হেঁটে যেতে যেতে, মনে মনে) সাইকেল ঠিক করার এত শখ? একবারও তো তাকাতে পারছে না! একটা কথা বললে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? খড়খড়ে কাঠ একটা!
​(বৃষ্টি ইচ্ছা করে তার হাতের রুমালটা রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে চলে যায়। আকাশ সেটা খেয়াল করে। সে সাইকেল রেখে রুমালটা তুলে নেয়। বাতাসে রুমালের সুবাস শুকতে শুকতে একটা বোকা হাসি দেয়।)
​দৃশ্য ২: দুপুর, বৃষ্টির বাড়ির উঠোন
​(বৃষ্টির মা এবং আকাশের বাবা একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছেন। উঠোনের এক কোণায় আকাশ আর বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ একটা পেয়ারা পেড়ে বৃষ্টিকে দিচ্ছে।)
বৃষ্টি: (মুখ বাঁকিয়ে) আমি খাব না। তোমার হাতের পেয়ারা তেতো।
আকাশ: (ধমকের সুরে) ভিটামিন সি আছে, চুপচাপ খাও। দিন দিন শুকিয়ে তো শুঁটকি হয়ে যাচ্ছ।
বৃষ্টি: (পেয়ারাটা কেড়ে নিয়ে কামড় দিয়ে) আমি শুঁটকি? আর তুমি কি? তুমি একটা জলহস্তী!
​(দূরে বসে ওদের বাবা-মা এই ঝগড়া দেখছেন এবং মৃদু হাসছেন।)
বৃষ্টির মা: (নিচু স্বরে) দেখলে রহমান ভাই? মুখে কেউ কিছু বলবে না, কিন্তু সারাদিন একজন আরেকজনের পিছে লেগে থাকবে।
আকাশের বাবা: (হেসে) জানি ভাবী। এদের এই লুকোচুরি খেলা দেখতেই আমার ভালো লাগে। চলুক না, দেখি কতদূর যায়!
​দৃশ্য ৩: বিকেল, হঠাৎ মেঘলা আকাশ (টুইস্ট)
​(বৃষ্টির বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার আওয়াজ এবং ব্যস্ততা শোনা যাচ্ছে। আকাশ কৌতূহল নিয়ে ওখান দিয়ে যাচ্ছিল। বৃষ্টির বাবা তাকে ডেকে ভেতরে নিলেন।)
​বৃষ্টির বাবা: আকাশ, একটা ভালো খবর আছে। বৃষ্টির মামার বাড়ির ওখান থেকে একটা খুব ভালো সম্বন্ধ এসেছে। পাত্রী হিসেবে বৃষ্টিকে ওদের পছন্দ। আগামী পরশুই বিয়ে, ওর মামার বাড়িতেই সব আয়োজন হবে। আমরা সবাই কাল সকালেই রওনা দিচ্ছি।
​(আকাশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। সে কিছু বলতে গিয়েও গলার কাছে কথা আটকে যায়।)
আকাশ: (অস্ফুট স্বরে) বিয়ে?... কালই চলে যাচ্ছেন?
​দৃশ্য ৪: সন্ধ্যা, নদীর ঘাট (বিদায় বেলা)
​(আকাশ একা নদীর ঘাটে বসে আছে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। এমন সময় দূর থেকে বৃষ্টি দৌড়ে আসে। তার চোখে জল। পেছনে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন ওদের বাবা-মা, তারা সব বুঝতে পেরেও ওদের একটু একা সময় দিচ্ছেন।)
​বৃষ্টি: (হাঁপাতে হাঁপাতে আকাশকে দেখে) তুমি এখানে বসে আছো? আর আমি তোমাকে সারা গ্রাম খুঁজছি!
আকাশ: (কণ্ঠ চেপে) শুনলাম তোমার বিয়ে। অভিনন্দন।
বৃষ্টি: (কান্না চেপে, রাগে) শুধু অভিনন্দন? এই একটা কথাই বলতে পারলে? তুমি আস্ত একটা পাথর!
​(আকাশ চুপ করে থাকে, নিচের দিকে তাকিয়ে। বৃষ্টি আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারে না। সে আচমকা দৌড়ে গিয়ে আকাশকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আকাশের বুকে মাথা রেখে ও ডুকরে কেঁদে ওঠে।)
বৃষ্টি: (কেঁদে কেঁদে) আমি চলে যাচ্ছি আকাশ... আমাকে আটকে নাও না প্লিজ! একবার বলো যে তুমি আমাকে ভালোবাসো!
​(আকাশ স্তব্ধ হয়ে যায়। তার হাত দুটো কাঁপতে কাঁপতে বৃষ্টির পিঠে হাত ছোঁয়ানোর আগেই বৃষ্টি নিজেকে সামলে নেয়। সে জড়িয়ে ধরা ছেড়ে দেয় এবং চোখের জল মুছতে মুছতে উল্টো দিকে দৌড় দেয়।)
বৃষ্টি: (যেতে যেতে) ভালো থেকো! আর কোনোদিন আমার মুখ দেখতে হবে না!
​(পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ওদের বাবা-মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বৃষ্টি চলে যাওয়ার পর আকাশ একা দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ পুরো চারপাশটা তার কাছে শূন্য মনে হয়। সে বুঝতে পারে, এত বছর ধরে যে বাতাস সে নিচ্ছিল, তার নামই ছিল 'বৃষ্টি'। ওকে ছাড়া সে বাঁচবে না।)
​দৃশ্য ৫: ক্লাইম্যাক্স (পরদিন সকাল - বিয়ের বাড়ি / পথ)
​(বৃষ্টিদের পুরো পরিবার মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। আকাশ তার ঘরে একা বসে আছে। চারদিকে বৃষ্টির ফেলে যাওয়া স্মৃতি— সেই রুমালটা তার হাতে। হঠাৎ আকাশের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সে আর থাকতে পারে না।)
আকাশ: (চিৎকার করে) না! এভাবে আমি ওকে যেতে দিতে পারি না! ও শুধু আমার!
​(আকাশ ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়। তার সাইকেলটা নিয়ে প্যাডেল মারতে শুরু করে। তীব্র গতিতে সে সাইকেল চালাচ্ছে। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে সে বৃষ্টির মামার বাড়ির দিকে ছুটছে।)
​দৃশ্য ৬: শেষ দৃশ্য (মিষ্টি মিলন)
​(বৃষ্টির মামার বাড়িতে বিয়ের মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে। বৃষ্টি কনের সাজে গুমsum হয়ে বসে আছে। এমন সময় আকাশ হাঁপাতে হাঁপাতে, ধুলোবালি মেখে সেখানে হাজির হয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে সোজা বৃষ্টির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।)
আকাশ: (বুক ফুলিয়ে, জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে) আমি তোমাকে বিয়ে করতে দেব না!
বৃষ্টি: (অবাক হয়ে) আকাশ? তুমি?
আকাশ: (সবার সামনে বৃষ্টির হাত ধরে) হ্যাঁ, আমি! আমি একটা বোকা, জলহস্তী, পাথর! কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। আমি তোমাকে ভালোবাসি, বৃষ্টি! খুব ভালোবাসি!
​(সবাই চুপ হয়ে যায়। বৃষ্টি চোখের জল মুছে মিটিমিটি হাসতে থাকে। ঠিক তখনই পেছন থেকে বৃষ্টির বাবা আর আকাশের বাবা হেসে উঠলেন।)
​বৃষ্টির বাবা: (হেসে) যাক বাবা! অবশেষে ছেলেটার মুখ ফুটল!
আকাশ: (হতভম্ব হয়ে) মানে?
আকাশের বাবা: (আকাশের পিঠে চাপড়ে) আরে গাধা! তোর মুখ থেকে এই কথাটা বের করার জন্যই তো আমরা এই নকল বিয়ের নাটক সাজিয়েছিলাম! কোনো পাত্র-টাত্র আসেনি, তোর মামার বাড়ির এই আয়োজন আসলে তোর আর বৃষ্টির বিয়ের জন্যই!
​(আকাশ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। বৃষ্টি মুচকি হেসে আকাশের কানে কানে বলে—)
বৃষ্টি: দুষ্টুমি তো অনেক হলো, এবার মিষ্টি করে বর সেজে এসো তো শুনি!
​(সবাই হেসে ওঠে। আকাশ আর বৃষ্টি একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসে। ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি রোমান্টিক গান বেজে ওঠে এবং স্ক্রিন ধীরে ধীরে ফেড আউট হয়ে যায়।)
​...সমাপ্ত...

গান👇

​(ছেলে):
বলবো বলবো করেও তোমায়, বলা হলো না মনের কথা,
বুকের ভেতর লুকিয়ে ছিল, মিষ্টি কিছু ব্যাকুলতা।
(মেয়ে):
তুমিও বোঝো, আমিও বুঝি— চোখের ভাষায় লুকোচুরি,
অভিমানের মেঘ জমিয়ে, কাটল যে দিন ছলাকলা।
(উভয়ে):
আজকে তবে কাটুক নীরবতা,
বলা হলো অবশেষে মনের কথা...
​🎼 অন্তরা ১ (Verse 1)
​(ছেলে):
তুমি ছাড়া এ জীবন যে, শূন্য মরুভূমি,
নিশ্বাসে মোর জড়িয়ে আছ, শুধুই শুধু তুমি।
হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ার, জাগলো যখন ভয়,
পাথর বুকে ভাঙলো বাঁধন, মন তো মানে না পরাজয়!
(মেয়ে):
পথ চেয়ে মোর কাটতো প্রহর, তুমি আসবে কবে?
হাতটি ধরে বলবে ডেকে— "আমায় আগলে রাখতে হবে।"
​🎼 অন্তরা ২ (Verse 2)
​(মেয়ে):
দুষ্টুমিতে কেটেছে দিন, মিষ্টি হলো শেষটা,
তোমায় একটু খ্যাপানোরই, ছিল মধুর চেষ্টা।
(ছেলে):
হারিয়ে ফেলার ছলে দিলে, ভালোবাসার ডাক,
আমাদের এই গল্পটা আজ, মনের ফ্রেমে বন্দি থাক।
(উভয়ে):
আজকে তবে কাটুক নীরবতা,
বলা হলো অবশেষে মনের কথা...
বলবো বলবো করেও তোমায়, বলা হলো না মনের কথা।

Tuesday, 16 June 2026

গান👉 হৃদয়ে তুফান। ছড়াকার👉 কিশোর দুলাল রায়

হৃদয়ে তুফান 
কিশোর দুলাল রায় 

তোর ওই চোখের ইশারায়,
মনটা আমার উড়ে যায়।
কী যে এক জাদু করলি রে তুই,
বুকেরই ভেতর ঝড় বয়ে যায়!
​আজকে রাতে হবে না তো ঘুম,
হৃদয়ে লেগেছে প্রেমের ধুম।
আয় না কাছে, আর দূরে থাকিস না,
প্রেমের এই বাজিটা তুই হারিস না!

তুই যেন এক মিষ্টি হাওয়া,
তোর কাছেই তো সব চাওয়া।
তোর হাসিতেই মনটা হারায়,
মন যে আমার মাতাল পাড়ায়!
​হেই... দেখ না চেয়ে আমার দিকে,
তুই ছাড়া সব লাগে ফিকে।
আজকে রাতে হবে না তো ঘুম,
হৃদয়ে লেগেছে প্রেমের ধুম!

তুই আমার ধামাকা, প্রেমের ইশারা,
তোকে ছাড়া বেঁচে থাকা যে দিশাহারা।
তুই আমার ধামাকা, বুকে দিলি টান,
তোর জন্য দিয়ে দেবো আমার এই জান!

তোর ওই ঠোঁটের মিষ্টি হাসি,
আমায় করায় শুধু যে রূপসী।
কাছে আয় না ওরে আমার সোনা,
প্রেমের গল্পে হোক না নতুন সূচনা!
​রাতের তারা সাক্ষী থাক না,
মেলবো দুজনে প্রেমের ডানা।
আজকে রাতে হবে না তো ঘুম,
হৃদয়ে লেগেছে প্রেমের ধুম!

ধামাকা... প্রেমের ধামাকা!
তুই আমার বুকে দিলি টান...
তোর জন্য দিয়ে দেবো আমার এই জান!
হৃদয়ে তুফান... শুধু তুই আর আমি...
হ্যাঁ, তুই আমার সবচেয়ে দামি!

Monday, 15 June 2026

ছড়া👉ভালোবাসার প্রথম গোলাপ। ছড়াকার👉 কিশোর দুলাল রায়

< ভালোবাসার প্রথম গোলাপ কিশোর দুলাল রায় আকাশ জুড়ে মেঘের মেলা, মনে খুশির কাঁপন, তুমি এসে বদলে দিলে, আমার চেনা আপন। মিটে গেল মনের মাঝে, যত ছিল ক্ষোভ-বিলাপ, তোমার হাতেই রইলো আমার, ভালোবাসার প্রথম গোলাপ। একলা রাতে চাঁদের আলো, লাগত বড় একা, জানতাম না তো কবে হবে, তোমার সাথে দেখা। ধূসর চুলে জড়িয়ে দিলে, সুখের এক আলাপ, তোমার হাতেই রইলো আমার, চোখের কোণে জমতো যে জল, হারিয়ে গেছে আজ, তুমি আমার মেঘলা আকাশ, তুমি আমার সাজ। ঘুচে গেল আঁধার রাতের, যত অনুতাপ, তোমার হাতেই রইলো আমার, ভালোবাসার প্রথম গোলাপ।

জাফলং, সিলেট।

জাফলং, সিলেট।

Sunday, 14 June 2026

ছড়া👉কাল্লু মামার কাঁচি। ছড়াকার👉কিশোর দুলাল রায়

কাল্লু মামার কাঁচি

কিশোর দুলাল রায় 

​খচাখচ খচ কাঁচি চলে,

কাল্লু মামার সেলুনে,

রনি খোকন বসল গিয়ে

বিকেলের ওই বেলুনে!

​রনি বলে, "মামাগো,

চুলটা করো ছোট,"

কাল্লু মামা হেসে বলে,

"একটু চুপটি ওঠো!"

​ফিসফিসিয়ে চলে কথা,

উড়ে পড়ে চুল,

আয়না দেখে রনি খোকন

ভাবল একী ভুল!

​এদিক ওদিক ন্যাড়া মাথা,

ওপর পানে খাড়া,

এমন কাটিং দেখে খোকন

পুরোই দিশেহারা!

​কান্নামুখে রনি খোকন

চলল বাড়ির পানে,

সবাই বলে, "বাহ্ খোকন তো

নতুন সাজে জানে!"

​খুশি হয়ে রনি তখন

নাচে তা থৈ তা থৈ,

"কাল্লু মামার মতো ভালো

নাপিত আর তো কই!"

Saturday, 13 June 2026

ছড়া_তুমি আমার পহেলা বৈশাখ_ছড়াকার কিশোর দুলাল রায়


তুমি আমার পহেলা বৈশাখ 
কিশোর দুলাল রায় 

তুমি আমার নতুন বছরের প্রথম পহেলা বৈশাখ,
আমার চেনা চেনা জীবনে তুমি এক অচেনা ডাক।
রাঙা শাড়ির আঁচল যেমন বাতাসে দোলে,
তেমনি করে তুমিও যে আমায় নিলে কোলে।
তুমি আমার নতুন বছরের প্রথম পহেলা বৈশাখ...
বৈশাখী ওই মেলায় যেমন রঙের মেলা বসে,
তোমার চোখের এক ইশারায় মন যে আমার হাসে।
হাতে তোমার কাঁচের চুড়ি, কপালে ওই লাল টিপ,
আমার অন্ধকার এই মনে তুমি জ্বেলে দিলে প্রদীপ।
তুমি আমার নতুন বছরের প্রথম পহেলা বৈশাখ...
নতুন দিনের নতুন সূর্য যেমন আলো ছড়ায়,
তোমার ছোঁয়া আমার বুকে এক নতুন আশার গান গায়।
পুরোনো সব দুঃখ-গ্লানি যাক না ধুয়ে যাক,
আমাদের এই প্রেমের গল্প অমর হয়ে থাক।
তুমি আমার রোদ-বৃষ্টি, তুমিই চৈত্রের শেষ রাত,
নতুন বছরের প্রথম সকালে তোমার হাতেই আমার হাত।
তুমি আমার নতুন বছরের প্রথম পহেলা বৈশাখ,
আমার চেনা চেনা জীবনে তুমি এক অচেনা ডাক।