নাটকঃ রোদ-ছায়ার উঠোন
মূল চরিত্রসমূহ:
- রাশেদ সাহেব (৬০): পরিবারের অভিভাবক। একজন অবসরপ্রাপ্ত সৎ সরকারি কর্মকর্তা।
- ফাতেমা বেগম (৫৫): রাশেদ সাহেবের স্ত্রী। মায়াবতী ও পুরো পরিবারকে আগলে রাখা মা।
- আসিফ (২৮): বড় ছেলে। দায়িত্ববান, শান্ত কিন্তু বেকারত্বের গ্লানিতে ভুগছে।
- আরিফ (২৫): ছোট ছেলে। চঞ্চল, আধুনিক এবং দ্রুত বড়লোক হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার।
- মায়া (২২): একমাত্র মেয়ে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। চঞ্চল, হাসিখুশি ও পুরো বাড়ির প্রাণ।
- সুমি (২৬): আরিফের স্ত্রী। অহংকারী, হিংসুটে এবং সবসময় নিজেকে অন্যের চেয়ে সেরা প্রমাণ করতে ব্যস্ত।
📺 পর্ব ১
হাসিমুখের আড়ালে মেঘ
(দৃশ্য ১: রাশেদ সাহেবের বসার ঘর - সকাল)
মধ্যবিত্ত গোছানো একটা ঘর। রাশেদ সাহেব চশমা চোখে খবরের কাগজ পড়ছেন। ফাতেমা বেগম চা নিয়ে এলেন।
ফাতেমা: (চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে) হ্যাঁগো, আসিফের চাকরিটার কিছু হলো? ছেলেটা মুখে কিছু বলে না, কিন্তু সারারাত জেগে থাকে। বুকটা ফেটে যায় দেখতে।
রাশেদ সাহেব: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) সততার দাম এই সমাজে কম, ফাতেমা। ও তো কোনো অনৈতিক উপায়ে চাকরি নেবে না। একটু ধৈর্য ধরো, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।
(এমন সময় আরিফ আর সুমি ড্রয়িংরুমে ঢোকে। সুমির হাতে একটা দামি শাড়ির প্যাকেট।)
সুমি: (উচ্চস্বরে, যেন সবাই শুনতে পায়) আম্মা, দেখেন আমার ভাইয়া ইন্ডিয়া থেকে কী সুন্দর সিল্কের শাড়ি পাঠিয়েছে! আজকালকার দিনে অবশ্য এসব দামি শাড়ি দেওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না।
আরিফ: (স্মার্টফোন টিপতে টিপতে) আরে সুমি, সবাইকে ওসব দেখিয়ে কী হবে? যার ভাগ্য ভালো সে এমনিতেই পায়।
ফাতেমা: (খানিকটা মলিন হেসে) খুব সুন্দর হয়েছে মা। আল্লাহ তোমার ভাইকে ভালো রাখুক।
(দৃশ্য ২: বাড়ির ছাদ - বিকেল)
মায়া আর আসিফ ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। মায়া বুঝতে পারছে তার বড় ভাইয়া মানসিকভাবে কতটা চাপে আছে।
মায়া: (আসিফের কাঁধে হাত রেখে) কী রে বড় ভাইয়া? মুখটা এমন শুকিয়ে রেখেছিস কেন? তোর কি মন খারাপ?
আসিফ: (জোর করে হেসে) ধুর পাগলী! মন খারাপ হতে যাবে কেন?
মায়া: তুই আমার থেকে লুকাতে পারবি না। জানি, চাকরিটা এবারও হয়নি। কিন্তু মনে রাখিস, তুই এই শহরের সবচেয়ে সেরা ভাই। তোর মেধা আছে, একদিন তুই ঠিক সফল হবি। তখন তোর এই বোন তোর টাকায় আইসক্রিম খাবে!
আসিফ: (হেসে ফেলে মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়) তুই আসলেই আমার ঘরের লক্ষ্মী রে। তোর এই হাসিটাই আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।
(দৃশ্য ৩: আরিফ ও সুমির ঘর - রাত)
রুমে সুমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে গহনা গোছাচ্ছে। আরিফ বিছানায় শুয়ে ল্যাপটপ দেখছে। সুমির চোখেমুখে এক অদ্ভুত হিংসার চাদর।
সুমি: (বিরক্ত হয়ে) আচ্ছা আরিফ, তোমার এই বড় ভাইয়া আর কতদিন আমাদের ঘাড়ে বসে খাবে? তোমার বাবা তো রিটায়ার্ড। এখন সংসারের সিংহভাগ খরচ তো তুমিই চালাও।
আরিফ: (একটু বিরক্ত হয়ে) সুমি, ভাইয়া চেষ্টা করছে। তাছাড়া এটা ভাইয়ারও বাড়ি।
সুমি: বাড়ি বললেই হলো? তোমার বাবা তো ফ্ল্যাটটা এখনো কারও নামে লিখে দেননি। তুমি যদি এখনই নিজের ভাগ বুঝে না নাও, তবে ওই বেকার ভাইয়া আর বোনটাই সব গিলে খাবে। আমি কিন্তু আমার বাচ্চার ভবিষ্যৎ এভাবে নষ্ট হতে দেব না!
আরিফ: (কিছুক্ষণ চুপ থেকে, সুমির কথায় প্রভাবিত হয়ে) হুম... তুমি ভুল বলোনি। বাবা ইদানীং আসিফ ভাইয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। আমাকে কিছু একটা করতেই হবে।
(দৃশ্য ৪: ডাইনিং টেবিল - রাত)
পুরো পরিবার একসাথে রাতের খাবার খাচ্ছে। আনন্দ-হাসির মাঝেই হঠাৎ ছন্দপতন।
রাশেদ সাহেব: আসিফ, কাল সকালে আমার সাথে একটু ব্যাংকে যাবি। আমার পেনশনের কিছু কাজ বাকি আছে।
আরিফ: (হঠাৎ চামচ টেবিলে ছুড়ে মেরে) বাবা, সব কাজে আসিফ ভাইয়াকে কেন লাগবে? ও তো একটা টাকাও সংসারে দেয় না। অথচ দিনশেষে সব সিদ্ধান্ত ও-ই নেয়!
ফাতেমা: (হতভম্ব হয়ে) আরিফ! ও তোর বড় ভাই, ওভাবে কথা বলছিস কেন?
সুমি: (আরিফকে সমর্থন করে) মা, আরিফ তো ভুল কিছু বলেনি। সংসারে যে টাকা দেয়, তার কথার কোনো মূল্য নেই এই বাড়িতে।
আসিফ: (মাথা নিচু করে, চোখে জল আটকে) আরিফ, সুমি... তোমরা ভুল বুঝো না। আমি কাল যাব না বাবা, আরিফই যাক। আমার একটু তাড়া আছে।
(আসিফ না খেয়ে টেবিল থেকে উঠে নিজের ঘরে চলে যায়। মায়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। রাশেদ সাহেব স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন।)
📌 আগামী পর্বের আকর্ষণ:
- আসিফ একটা সাধারণ কোম্পানিতে ডেলিভারি বয়ের কাজ শুরু করে, যা দেখে সুমি পাড়ায় মহলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করে।
- মায়ার বিয়ে ঠিক হয় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে, কিন্তু সুমি সেই বিয়ে ভাঙার জন্য গোপনে মেয়ের বাড়ির লোকজনকে আসিফের বেকারত্ব নিয়ে আজেবাজে কথা বলে।
- আরিফ যখন ব্যবসায় বড়সড় প্রতারণার শিকার হয়ে জেলে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন এই "বেকার" বড় ভাই আসিফই নিজের সবকিছু বাজি রেখে ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে।
নাটকের মূল বার্তা: বাস্তব জীবনে হিংসা আর লোভ সাময়িকভাবে মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে, কিন্তু দিনশেষে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, রক্ত ও পরিবারের বন্ধনই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
📺 পর্ব ২
তপ্ত রোদ আর স্বার্থের ছায়া
(দৃশ্য ১: রাশেদ সাহেবের বসার ঘর - সকাল)
রাতের ঝগড়ার পর সকালের পরিবেশটা বেশ থমথমে। আসিফ কাঁধে একটা সাধারণ ব্যাগ ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফাতেমা বেগম রান্নাঘর থেকে চোখ মুছতে মুছতে বের হলেন।
ফাতেমা: (আসিফের হাত ধরে) বাবা আসিফ, না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস? কাল রাতে আরিফ আর সুমি যা বলেছে, তার জন্য আমি ওদের হয়ে তোর কাছে মাফ চাচ্ছি রে বাবা। তুই এভাবে মুখ কালো করে থাকিস না।
আসিফ: (মৃদু হেসে মায়ের হাত জড়িয়ে ধরে) আরে আম্মা, তুমি পাগল হয়েছ? ও আমার ছোট ভাই, ও একটু রাগ করতেই পারে। আমি কোনো মনে কষ্ট রাখিনি। আসলে আজ আমার একটা ইন্টারভিউ আছে, তাই একটু জলদি বের হচ্ছি। দোয়া করো।
ফাতেমা: (মাথায় হাত দিয়ে) আল্লাহ তোকে সফল করুক, বাপ।
(আসিফ বের হতেই আড়াল থেকে সুমি মুখ বাঁকিয়ে কুটিল হাসে।)
সুমি: (মনে মনে) ইন্টারভিউ নাকি ঘোরার বাহানা! আজই পাড়ার ঘটক ঘটকালি আপাকে ডাকতে হবে। মায়ার বিয়েটা এই বাড়ি থেকে যত দ্রুত বিদায় করা যায়, ততই ভালো।
(দৃশ্য ২: শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তা - দুপুর)
প্রচণ্ড রোদ। আসিফ ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে, মাথায় একটা ক্যাপ দিয়ে মোটরসাইকেলে করে বড় বড় পার্সেল ডেলিভারি দিচ্ছে। সে আসলে একটি কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি বয় হিসেবে জয়েন করেছে, কিন্তু পরিবারকে জানায়নি।
মেধার এত বড় অবমূল্যায়ন আর রোদের তাপে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে চায়, তাও সে নিজেকে শক্ত রাখে।
আসিফ: (নিজের মনে) সংসারে অভাব আর অবহেলা থাকলে ইগো ধরে রেখে লাভ নেই। বাবার পেনশনের টাকা দিয়ে কতদিন চলবে? আমাকে তো একটা কিছু করতেই হতো।
(দৃশ্য ৩: রাশেদ সাহেবের বাড়ির উঠোন - বিকেল)
উঠোনে সুমি আর পাড়ার ঘটক ঘটকালি আপা বসে চা খাচ্ছেন। মায়াও সেখানে কাপড় শুকাতে দিচ্ছিল।
ঘটকালি আপা: বুঝলে সুমি বউমা, পাত্র কিন্তু এক্কেবারে রাজপুত্তুর! লন্ডনে থাকে, নিজের ব্যবসা আছে। মেয়ে পছন্দ হলেই কাজী ডেকে বিয়ে।
সুমি: (মায়ার দিকে ইশারা করে উচ্চস্বরে) পাত্র তো ভালো হবেই আপা। তবে আমাদের মায়াকে নিলে কিন্তু পাত্রপক্ষকে একটু মানিয়ে নিতে হবে।
ঘটকালি আপা: (অবাক হয়ে) কেন? মায়া তো দেখতে পরীর মতো, পড়াশোনাতেও ভালো!
সুমি: (মিথ্যা আফসোসের ভান করে) আরে আপা, রূপ দিয়ে কি পেট ভরে? মায়ার বড় ভাই আসিফ ভাইয়াকে তো চেনেন? এমএ পাস করে ঘরে বসে থাকে, কোনো কাজকাম নেই। আজকাল তো শুনছি রাস্তায় রাস্তায় মানুষের পার্সেল টানে! এমন বেকার আর ছোটলোক ভাই ঘরে থাকলে ভালো ঘরের মানুষ কি সহজে কুটুম্বিতা করতে চায়? আপনারা একটু চেপে যাবেন পাত্রপক্ষের কাছে, কেমন?
(মায়ার হাত থেকে কাপড়ের বালতিটা পড়ে যায়। সে সুমির এমন অপমানজনক কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।)
মায়া: (কেঁদে ফেলে) ভাবি! বড় ভাইয়া সম্পর্কে এত বড় মিথ্যা কথা তুমি কীভাবে বললে? ভাইয়া চাকরি খুঁজছে, ও কোনো ছোটলোক নয়!
সুমি: (চেঁচিয়ে) মিথ্যা কেন হবে? নিজের চোখে দেখে এসো তোমার ভাইয়া রাস্তায় কী করে! সতীন-কাঁটা দূর করতে চাইলে পাত্রপক্ষকে সত্যি-মিথ্যা মিলিয়েই বলতে হয়, বুঝলে?
(দৃশ্য ৪: আরিফের অফিস - সন্ধ্যা)
আরিফ তার এক বন্ধুর সাথে বসে কফি খাচ্ছে। আরিফের চোখেমুখে এক অদ্ভুত উত্তেজনা।
বন্ধু: দেখ আরিফ, এই রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টে যদি তুই মাত্র ১০ লাখ টাকা ইনভেস্ট করতে পারিস, তবে আগামী তিন মাসে তোর টাকা ডাবল হয়ে যাবে। তুই এক ধাক্কায় কোটিপতি!
আরিফ: (উত্তেজিত হয়ে) ১০ লাখ টাকা? কিন্তু এত টাকা আমি হুট করে কোথায় পাব? আমার সেভিংস তো মাত্র ৩ লাখ।
বন্ধু: কেন? তোর বাবার ওই ফ্ল্যাটটা আছে না? ওইটার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা পেপারস দেখিয়ে ব্যাংক থেকে একটা শর্ট টার্ম লোন নিয়ে নে। ভাইয়া তো বেকার, ও কিছু বুঝবে না। লোন শোধ করে দিবি তিন মাসে, কেউ জানবেও না!
আরিফ: (একটু ইতস্তত করে) বাবার সই জাল করতে হবে? যদি ধরা পড়ে যাই?
বন্ধু: আরেহ! তুই তো তোর বাপেরই সন্তান। তুই বড়লোক হলে তো তোর বাপেরই নাম হবে। একটু রিস্ক না নিলে লাইফে বড় হওয়া যায় না, দোস্ত!
(আরিফ লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারছে না সে এক মহাবিপদের দিকে পা বাড়াচ্ছে।)
(দৃশ্য ৫: রাশেদ সাহেবের বসার ঘর - রাত)
রাতে আসিফ বাড়ি ফেরে। শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত, পা চলছে না। বসার ঘরে রাশেদ সাহেব গম্ভীর মুখে বসে আছেন। মায়াও এক কোণে কাঁদছে।
রাশেদ সাহেব: (কঠোর গলায়) আসিফ! তুই নাকি কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারি বয়ের কাজ করছিস? রাস্তায় রাস্তায় মানুষের দুয়ারে পার্সেল পৌঁছাচ্ছিস?
আসিফ: (অবাক হয়ে) বাবা... আপনি কীভাবে জানলেন?
রাশেদ সাহেব: সুমি আজ বিকেলে পাড়ার লোকের মুখে শুনেছে। তুই এত বড় ডিগ্রি নিয়ে এই ছোট কাজ করছিস? আমার মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিলি!
আসিফ: (ধীরস্থিরভাবে বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে) বাবা, কোনো কাজই ছোট নয়। চুরি বা ডাকাতি করার চেয়ে সততার সাথে মানুষের পার্সেল পৌঁছে দেওয়া অনেক সম্মানের। আমি বেকার বসে থেকে আপনার ওপর বোঝা হতে চাইনি।
(আসিফের এই জবাবে রাশেদ সাহেব কোনো কথা বলতে পারেন না। সুমি আর আরিফ দরজার আড়াল থেকে মুচকি হাসে।)
আসিফ: (আরিফ ও সুমির দিকে তাকিয়ে) আর হ্যাঁ, আমার এই ছোট কাজের জন্য যদি মায়ার বিয়েতে কোনো সমস্যা হয়, তবে আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। আমার বোনের সুখের জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।
(মায়া এসে আসিফকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। পুরো ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে, যা ঝড় ওঠার আগের পূর্বাভাস।)
📌 আগামী পর্বের আকর্ষণ:
- আরিফ জালিয়াতি করে রাশেদ সাহেবের ফ্ল্যাটের দলিল বন্ধক রেখে লোন নেয় এবং তার বন্ধু সেই টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
- ব্যাংক থেকে যখন বাড়ি ক্রোক করার নোটিশ আসে, তখন হৃদরোগে আক্রান্ত হন রাশেদ সাহেব।
- পরিবারের এই চরম বিপদে সুমি তার বাপের বাড়ি চলে যায়, আর "ডেলিভারি বয়" আসিফ একাই পুরো পরিস্থিতি সামলানোর চ্যালেঞ্জ নেয়।
📺 পর্ব ৩
লোভের ফাঁদ আর ভাঙনের সুর
(দৃশ্য ১: আরিফের বন্ধুর অফিস - সকাল)
অফিস কক্ষটি বেশ বিলাসবহুল। আরিফ একটা কালো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে খুব সতর্কভাবে ঘরে ঢোকে। তার চোখ-মুখে ভয় আর উত্তেজনার ছাপ। বন্ধু সায়মন ড্রয়ার থেকে কিছু কাগজ বের করে টেবিলে রাখল।
সায়মন: (মুচকি হেসে) কী দোস্ত? পেপারস রেডি? সাইন এনেছিস তো?
আরিফ: (ব্যাগ থেকে দলিল বের করে) হ্যাঁ, এনেছি। বাবার সইটা হুবহু নকল করতে আমার হাত কাঁপছিল রে। ব্যাংক থেকে লোনের ১০ লাখ টাকা তো আজই রিলিজ হবে, তাই না?
সায়মন: (দলিলটা লুফে নিয়ে) একদম! তুই শুধু টাকাটা আমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার কর। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই রিয়েল এস্টেটের প্রজেক্ট বুক হয়ে যাবে। তারপর দেখবি, তোর এই ভাঙা বাড়ির উঠোনে রোদ নয়, সোনায় মোড়ানো আলো চকচক করবে!
আরিফ: (মনে মনে) এবার দেখাব আসিফ ভাইয়াকে, কে আসল ছেলে আর কার কত ক্ষমতা!
(দৃশ্য ২: রাশেদ সাহেবের বাড়ির রান্নাঘর - দুপুর)
ফাতেমা বেগম রান্না করছেন। মায়া পাশে বসে সবজি কাটছে, কিন্তু তার মন ভালো নেই। গতদিনের ঘটনার পর সে বড় ভাইয়ার মুখটা দেখলেই কেঁদে ফেলছে।
মায়া: আম্মা, বড় ভাইয়া তো আজ সকাল থেকে একটা দানাও মুখে দেয়নি। কুরিয়ারের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রোদের মধ্যে বের হয়ে গেল। ভাবি কীভাবে পারল ভাইয়াকে সবার সামনে এত ছোট করতে?
ফাতেমা: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) সুমির স্বভাবটাই এমন রে মা। কিন্তু আমার ভয় অন্য জায়গায়—তোর আব্বা কাল রাত থেকে একটা কথাও বলেনি। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে আছে। এই ঘরের রোদটুকু যেন আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে।
(এমন সময় সুমি রান্নাঘরে ঢুকে একটা দামি ক্যাটালগ টেবিলের ওপর ছুড়ে মারে।)
সুমি: (অহংকারের সুরে) আম্মা, ঘটকালি আপা জানালেন পাত্রপক্ষ নাকি কাল বিকেলে মায়াকে দেখতে আসবে। আমি কিন্তু আমার বাবার বাড়ি থেকে ভালো ক্যাটারিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। ওই কুরিয়ার বয় ভাইয়াকে কিন্তু কাল বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করতে বারণ করবেন। পাত্রপক্ষ দেখলে কী ভাববে?
মায়া: (ঝাঁঝালো গলায়) ভাবি! মুখ সামলে কথা বলো। আমার বিয়ে হোক আর না হোক, আমার ভাইয়া এই বাড়ির প্রথম সন্তান। তাকে অপমান করার অধিকার তোমার নেই!
(দৃশ্য ৩: একটি অভিজাত রেস্তোরাঁ - বিকেল)
লন্ডন প্রবাসী পাত্র তার মায়ের সাথে বসে আছে। সুমি আর আরিফ তাদের সাথে কথা বলছে। সুমি পাত্রপক্ষকে পটাতে ব্যস্ত।
পাত্রের মা: আমাদের মেয়ে পছন্দ হয়েছে। কিন্তু শুনলাম মেয়ের বড় ভাই নাকি... মানে সাধারণ কোনো কাজ করেন?
সুমি: (তাড়াতাড়ি কথা কেড়ে নিয়ে) আরে না খালাম্মা! ওসব পাড়ার লোকের রটানো কথা। আসিফ ভাইয়া আসলে একটা বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির "লজিস্টিকস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজার"! ওনার আন্ডারে শত শত পার্সেল আর গাড়ি চলে।
আরিফ: (একটু অস্বস্তি নিয়ে) হ্যাঁ... মানে ভাইয়া আসলে একটু ফিল্ড ওয়ার্ক পছন্দ করে তো, তাই।
পাত্র: ওহ, দ্যাটস গ্রেট! তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই। আমরা কালই আপনাদের বাড়ি আসছি পাকা কথা বলতে।
(দৃশ্য ৪: রাশেদ সাহেবের বসার ঘর - রাত)
রাতে আসিফ বাড়ি ফেরে। সারাদিনের খাটুনিতে তার শার্ট ঘামে ভেজা। ঘরে ঢুকতেই সে দেখে রাশেদ সাহেব লিভিং রুমের সোফায় বসে বুক চেপে ধরে আছেন। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
আসিফ: (ছুটে গিয়ে) বাবা! কী হয়েছে আপনার? আম্মা, মায়া... তাড়াতাড়ি এসো!
রাশেদ সাহেব: (ক্ষীণ কণ্ঠে) আসিফ... আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে রে। কেমন যেন ছটফট লাগছে।
(ফাতেমা বেগম আর মায়া চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বের হয়। এমন সময় আরিফ আর সুমি বাইরে থেকে হাসতে হাসতে ঘরে ঢোকে।)
আসিফ: (আরিফকে দেখে চেঁচিয়ে) আরিফ! তুই কোথায় ছিলি? দেখ বাবার কী অবস্থা! তাড়াতাড়ি একটা সিএনজি বা ট্যাক্সি ডাক, বাবাকে হাসপাতালে নিতে হবে!
সুমি: (বিরক্ত হয়ে) উফ! বড়দা, সবসময় এত নাটক কেন করেন? বাবা তো প্রায়ই এমন করে। আজ আমরা এত বড় একটা ভালো খবর নিয়ে এলাম, আর আপনি এসেই সিন ক্রিয়েট করছেন?
আসিফ: (রেগে গিয়ে সুমির দিকে আঙুল উঁচিয়ে) সুমি! চুপ করো! এটা কোনো নাটক নয়। আরিফ, তুই গাড়ি ডাকবি নাকি আমি বাবাকে পিঠে করে নিয়ে যাব?
(আরিফ বাবার অবস্থা দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে যায় এবং ফোন বের করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে উদ্যত হয়।)
(दृश्य ৫: হাসপাতালের করিডোর - গভীর রাত)
রাশেদ সাহেবকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়েছে। ডাক্তাররা ভেতরে কাজ করছেন। বাইরে আসিফ অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। মায়া আর ফাতেমা বেগম কাঁদছেন। আরিফ এক কোনায় দাঁড়িয়ে সায়মনকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু সায়মনের ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে।
আরিফ: (মনে মনে, ঘামতে ঘামতে) সায়মনের ফোন বন্ধ কেন? ও তো বলেছিল আজ রাতের মধ্যেই লোন পাসের কনফার্মেশন মেসেজ আসবে। কোনো ঝামেলা হলো না তো?
(এমন সময় ডাক্তার কেবিন থেকে বের হয়ে এলেন। সবার মুখে উৎকণ্ঠা।)
ডাক্তার: রাশেদ সাহেবের ফ্যামিলি কে?
আসিফ: (সামনে এগিয়ে) আমি ওনার বড় ছেলে। বলুন ডাক্তার বাবু, বাবা কেমন আছেন?
ডাক্তার: ওনার একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে। মানসিক কোনো বড় আঘাত বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থেকে এটা হয়েছে। আপাতত আমরা ওনাকে অবজারভেশনে রেখেছি। তবে হাসপাতালের বিল আর ওষুধের জন্য এখনই কিছু টাকা জমা দিতে হবে। প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাগবে।
(৫০ হাজার টাকার কথা শুনে আরিফ আর সুমি পিছিয়ে যায়।)
সুমি: (আরিফের কানে কানে) আরিফ, তোমার কাছে তো কোনো টাকা নেই। খবরদার, তুমি দিতে যেও না। সব টাকা ওই প্রজেক্টে লকড।
আসিফ: (এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের পকেট থেকে জমানো টাকা এবং মেসের বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নেওয়া কিছু টাকা বের করে) ডাক্তার বাবু, এখানে ৩০ হাজার টাকা আছে। আমি বাকি ২০ হাজার টাকা এক ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো উপায়ে জোগাড় করে আনছি। আপনি বাবার চিকিৎসা শুরু করুন, প্লিজ!
(আসিফ যখন টাকার জন্য হাসপাতালের বাইরে দৌড়ে যায়, তখন আরিফের ফোনে একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ আসে। মেসেজটি দেখেই আরিফের হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়। সায়মন ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে এবং ব্যাংক আগামীকালই রাশেদ সাহেবের বাড়ি ক্রোক করার জন্য নোটিশ পাঠাচ্ছে!)
📌 আগামী পর্বের আকর্ষণ:
- পরদিন সকালে পাত্রপক্ষ মায়াকে দেখতে আসার ঠিক আগ মুহূর্তে বাড়িতে হাজির হয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
- জালিয়াতির কথা জানতে পেরে সুমি আরিফকে ডিভোর্সের হুমকি দিয়ে নিজের সব গহনা নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়।
- অসহায় আরিফ যখন পুলিশের ভয়ে পালাচ্ছে, তখন ডেলিভারি বয় আসিফ কীভাবে নিজের পরিবার আর বাবার সম্মান রক্ষা করবে?
📺 পর্ব ৪
ঝড়ের রাতে ছায়ার বিদায়, রোদ কি আসবে?
(দৃশ্য ১: হাসপাতালের করিডোর - ভোর)
আসিফ হাঁপাতে হাঁপাতে করিডোরে ঢোকে। সারারাত চেনা-অচেনা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে, নিজের মোটরসাইকেলটা বন্ধক রেখে সে বাকি ২০ হাজার টাকা জোগাড় করেছে। তার চোখ দুটো লাল, চেহারায় চরম ক্লান্তি। সে এসে দেখে আরিফ করিডোরের এক কোনায় মাথা নিচু করে কাঁপছে।
আসিফ: (আরিফের কাঁধে হাত দিয়ে) আরিফ, টাকা জোগাড় হয়ে গেছে। আমি কাউন্টারে জমা দিয়ে আসছি। তুই এত কাঁদছিস কেন? ডাক্তার বাবু কি নতুন কোনো খারাপ খবর দিয়েছেন? বাবা ঠিক আছেন তো?
আরিফ: (আসিফের পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে) ভাইয়া! আমাকে মাফ করে দাও। আমি শেষ হয়ে গেছি! আমি লোভের মুখে পড়ে নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছি ভাইয়া!
আসিফ: (হতভম্ব হয়ে আরিফকে টেনে তোলে) কী হয়েছে পরিষ্কার করে বল! সায়মন প্রজেক্টের কী করেছে?
আরিফ: (কাঁদতে কাঁদতে) সায়মন কোনো প্রজেক্ট করেনি ভাইয়া। ও একটা প্রতারক! ও বাবার সই জাল করে আমাদের এই বসতবাড়িটা ব্যাংকে বন্ধক রেখে ১০ লাখ টাকা লোন তুলে আজ রাতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। ব্যাংক আজ সকালেই আমাদের বাড়ি ক্রোক করতে লোক পাঠাবে!
(কথাটা শুনে আসিফের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যায়। কিন্তু সে নিজেকে শক্ত করে, কারণ সে ভেঙে পড়লে পুরো পরিবার ভেসে যাবে।)
(দৃশ্য ২: রাশেদ সাহেবের বাড়ির বসার ঘর - সকাল ১০টা)
লন্ডন প্রবাসী পাত্র তার মা-বাবাকে নিয়ে বসার ঘরে বসে আছে। ফাতেমা বেগম আর মায়াও মলিন মুখে বসে আছেন। সুমি দামি শাড়ি পরে পাত্রপক্ষের সামনে চা-নাস্তা পরিবেশন করছে এবং নিজের বাপের বাড়ির বড়ত্ব প্রকাশ করছে।
পাত্রের বাবা: আমাদের মেয়েকে খুব পছন্দ হয়েছে। আমরা চাচ্ছিলাম আগামী মাসেই শুভ কাজটা সেরে ফেলতে। রাশেদ সাহেব হাসপাতালে, তাই ওনার অনুমতিটা...
সুমি: (হেসে) ওনার অনুমতি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই খালাম্মা। এই বাড়ির সব বড় সিদ্ধান্ত তো আসলে আমার স্বামী আরিফ আর আমিই নিই। আপনারা নিশ্চিন্তে...
(এমন সময় বাইরে থেকে হুড়মুড় করে কয়েকজন কোট-টাই পরা ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং সাথে দুজন পুলিশ ঘরে ঢোকে। তাদের হাতে ক্রোকের লাল নোটিশ।)
ব্যাংক কর্মকর্তা: (উচ্চস্বরে) এই বাড়ির মালিক রাশেদ সাহেবের পরিবার কে আছেন? জালিয়াতি ও লোন ডিফল্টের দায়ে এই বাড়ি এখন সরকারি হেফাজতে নেওয়া হচ্ছে। আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে আপনাদের বাড়ি খালি করতে হবে!
পাত্রের মা: (লাফিয়ে উঠে) ওমা! এসব কী শুনছি? ব্যাংক ক্রোক করতে এসেছে? জালিয়াতির মামলা?
সুমি: (ফ্যাকাশে হয়ে) আপনারা ভুল করছেন! এটা রাশেদ সাহেবের বাড়ি, আমার শ্বশুরের বাড়ি! আমার স্বামী তো...
পুলিশ কর্মকর্তা: আপনার স্বামী আরিফ হোসেনই বাবার জাল সই দিয়ে এই লোনটা করিয়েছে এবং মূল হোতা সায়মন পলাতক। আরিফ হোসেনের নামেও অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে!
(পাত্রপক্ষ এক মুহূর্তও দেরি না করে বসার ঘর থেকে উঠে চলে যায়। পাত্রের মা যেতে যেতে বলেন, "এমন জালিয়াতি আর পুলিশ কেসের পরিবারে আমরা ছেলের বিয়ে দেব না!")
(দৃশ্য ৩: সুমির ঘর - সকাল ১১টা)
ঘরজুড়ে জিনিসপত্র ছিটানো। সুমি আলমারি খুলে তার সব গহনা এবং দামি শাড়ি ব্যাগে ভরছে। ফাতেমা বেগম দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁদছেন।
ফাতেমা: (কেঁদে কেঁদে) বউমা, বিপদের দিনে এভাবে আমাদের ফেলে চলে যাচ্ছো? আরিফ ভুল করেছে, কিন্তু তুমি তো এই বাড়ির অংশ!
সুমি: (ঝাঁঝালো গলায় ব্যাগ আটকাতে আটকাতে) কিসের অংশ? ওই চোর আর জালিয়াত আরিফের সাথে আমি এক সংসার করব? ও তো জেলে যাবে। আর এই ভাঙা বাড়ি তো ব্যাংক নিয়েই নিচ্ছে। আমি আমার বাপের বাড়ির দেওয়া গহনা একটাও এই চোরের বংশের জন্য রেখে যাব না। আজই আমি আমার বাবাকে দিয়ে ডিভোর্সের নোটিশ পাঠাব!
(সুমি ব্যাগ নিয়ে মায়া আর ফাতেমা বেগমকে ধাক্কা দিয়ে উঠোন পেরিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। উঠোনের রোদটা যেন মুহূর্তে তপ্ত ছায়ায় রূপ নেয়।)
(দৃশ্য ৪: হাসপাতালের আইসিইউ-র বাইরে - দুপুর)
আসিফ আর আরিফ দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য হাসপাতালের বাইরে আসছিল। এমন সময় পুলিশ এসে আরিফকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।
পুলিশ: আরিফ হোসেন? আপনি আন্ডার অ্যারেস্ট। বাবার সই জাল করে ব্যাংক জালিয়াতির অভিযোগে আপনাকে থানায় যেতে হবে।
আরিফ: (ভয়ে আসিফের পেছনে লুকিয়ে) ভাইয়া! আমাকে বাঁচাও! আমি জেলে গেলে মরে যাব ভাইয়া! আমি বুঝতে পারিনি সায়মন এমন করবে!
আসিফ: (পুলিশের সামনে হাত জোড় করে) অফিসার, আমার ভাই ভুল করেছে। ও প্রতারণার শিকার হয়েছে। ও অপরাধী নয়।
পুলিশ: সেটা আদালতে প্রমাণ হবে। আইন নিজের গতিতে চলবে। সরুন আমাদের কাজ করতে দিন।
(পুলিশ আরিফকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে। আরিফ চিৎকার করে কাঁদতে থাকে, "ভাইয়া, আমাকে বাঁচাও!" আসিফ স্তব্ধ হয়ে গাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ দিয়ে এবার জল গড়িয়ে পড়ে।)
(দৃশ্য ৫: থানার লক-আপ - বিকেল)
লক-আপের ভেতর আরিফ মেঝেতে বসে কাঁদছে। আসিফ লোহার শিকের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। আসিফের চোখে কোনো রাগ নেই, আছে শুধু এক ভাইয়ের জন্য আরেক ভাইয়ের অসীম মায়া।
আরিফ: (শিকের ফাঁক দিয়ে আসিফের হাত ধরে) ভাইয়া, সুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। সব গহনা নিয়ে গেছে। যে সুমির কথায় আমি তোমাকে এত অপমান করলাম, সে-ই আজ বিপদে আমাকে লাথি মেরে চলে গেল। আর তুমি... তুমি এখনো আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছো?
আসিফ: (আরিফের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে) তুই ভুল করেছিস আরিফ, কিন্তু তুই আমার ভাই। আমাদের শরীরে একই বাবার রক্ত। সুমি তোর সুখের দিনে পাশে ছিল, দুঃখের দিনে চলে গেছে—এটাই বাস্তব জীবন। কিন্তু তোর এই "বেকার" বড় ভাই তোকে এই নরকে পচতে দেবে না।
আরিফ: (কেঁদে ফেলে) কিন্তু আমাদের বাড়ি তো ব্যাংক সিলগালা করে দিচ্ছে! আম্মা আর মায়া কোথায় দাঁড়াবে ভাইয়া?
আসিফ: (দৃঢ় গলায়) যতক্ষণ এই বড় ভাই বেঁচে আছে, তোদের কাউকে আমি রাস্তায় দাঁড়াতে দেব না। আমি আইনি লড়াই লড়ব। সায়মনকে পুলিশ খুঁজে বের করবেই। আর ব্যাংকের লোন শোধ করার জন্য যদি আমাকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ডেলিভারির কাজ করতে হয়, আমি তা-ই করব। তুই শক্ত হ আরিফ, তোর ভাই এখনো হেরে যায়নি!
(আসিফের এই দৃঢ়তা আর ভালোবাসার সামনে আরিফের অহংকার আর হিংসার দেয়াল পুরোপুরি ধুলোয় মিশে যায়।)
📌 আগামী পর্বের আকর্ষণ:
- আসিফ তার মেসের বন্ধুদের সহায়তায় এবং নিজের জমানো শেষ সম্বল দিয়ে আম্মা আর মায়ার জন্য একটা ছোট দুই রুমের টিনের ঘর ভাড়া করে।
- মায়া তার বড় ভাইয়ার কষ্ট কমাতে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি শুরু করে এবং আসিফের কুরিয়ার সার্ভিসের কাজে গোপনে সাহায্য করার চেষ্টা করে।
- হঠাৎ করেই কুরিয়ার সার্ভিসের হেড অফিস থেকে আসিফের সততা ও পরিশ্রম দেখে তাকে এক বড় প্রোমোশনের চিঠি দেওয়া হয়, যা তাদের জীবনে নতুন রোদের আভাস আনে।
📺 পর্ব ৫: টিনের চালে বৃষ্টির সুর, অন্ধকারের পর আলোর রোদ্দুর
(দৃশ্য ১: একটি ছোট টিনের বাড়ি - সকাল)
শহরের এক কোণে সস্তায় ভাড়া নেওয়া ছোট দুই রুমের একটি টিনের বাড়ি। চারপাশের পরিবেশটা জরাজীর্ণ হলেও ঘরটা বেশ পরিপাটি। ফাতেমা বেগম চুলায় ভাত বসাচ্ছেন, ওনার চোখ দুটো এখনো ফোলা। মায়া ঘরের মেঝে ঝাড়ু দিচ্ছে। এমন সময় আসিফ তার কুরিয়ারের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ঘরে ঢোকে।
আসিফ: (হাতে একটা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে হাসিমুখে) আম্মা, দেখো তোমাদের জন্য গরম গরম পরোটা আর ভাজি নিয়ে এসেছি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।
ফাতেমা: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) বাবা আসিফ, তুই আমাদের জন্য এত করছিস, আর তোর ওই ছোট ভাইটা আজ তিনদিন ধরে থানার লক-আপে শুধু ডাল-ভাত খাচ্ছে। ও তো কোনোদিন এসব কষ্ট করেনি রে বাবা। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে।
আসিফ: (মায়ের মাথায় হাত রেখে) আম্মা, চিন্তা করো না। আমি লয়ারের সাথে কথা বলেছি। সায়মন যে জালিয়াতি করে আরিফকে ফাঁসিয়েছে, তার বেশ কিছু প্রমাণ পুলিশ পেয়েছে। আজই আরিফের জামিনের শুনানি আছে। আমি কোর্টে যাব।
মায়া: (এগিয়ে এসে) বড় ভাইয়া, আমি আজ থেকে দুটো টিউশনি শুরু করেছি। আর বসে থাকা যাবে না। তোমার কাঁধের বোঝা আমি কিছুটা হলেও হালকা করতে চাই।
আসিফ: (আবেগপ্লুত হয়ে মায়ার মাথায় হাত বুলায়) তুই আমার লক্ষ্মী বোন রে। তোরা পাশে থাকলে আমি পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করতে পারি।
(দৃশ্য ২: আদালত প্রাঙ্গণ - দুপুর)
আদালতের বাইরে আসিফ আর তাদের আইনজীবী দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুক্ষণ পর পুলিশ আরিফকে হাতকড়া পরিয়ে গাড়ি থেকে নামায়। আরিফের চেহারা মলিন, দাড়ি গালভর্তি, অহংকারের সেই লেশমাত্র নেই। আসিফকে দেখেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
আরিফ: (কাঁদতে কাঁদতে) ভাইয়া! সুমি আজ সকালে ওর উকিল দিয়ে ডিভোর্সের পেপার পাঠিয়েছে। ও আমার সাথে সব সম্পর্ক শেষ করে দিল! আমি সত্যিই একা হয়ে গেলাম ভাইয়া।
আসিফ: (আরিফের হাত চেপে ধরে) তুই একা নোস আরিফ। যে সুমি তোর সুসময়ের সঙ্গী ছিল, সে তোকে ছেড়ে গেছে। কিন্তু যে ভাইয়ার সাথে তুই অন্যায় করেছিলি, সে তোকে কখনো ছাড়বে নেই। তুই ভেতরে চল, আজই তোর জামিন হবে।
(আদালতের ভেতরে আইনজীবী প্রমাণ করেন যে আরিফ মূলত সায়মনের মূল চক্রান্তের শিকার এবং সে নিজে কোনো টাকা আত্মসাৎ করেনি। বিচারক আরিফের জামিন মঞ্জুর করেন, তবে শর্ত থাকে যে ব্যাংকের টাকা উদ্ধারে তাকে পুলিশকে সাহায্য করতে হবে।)
(দৃশ্য ৩: কুরিয়ার সার্ভিসের হেড অফিস - বিকেল)
আসিফ জামিনের কাগজ নিয়ে আরিফকে সাথে করে তার অফিসে আসে। সে বিগত কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো ডিউটি করতে পারেনি, তাই তার মনে ভয় ছিল চাকরিটা বুঝি চলেই গেল। এমন সময় অফিসের ম্যানেজার আসিফকে বসের রুমে ডাকেন।
ম্যানেজার: আসিফ সাহেব, আমাদের এমডি স্যার আপনাকে ডেকেছেন।
আসিফ: (ভীতু পায়ে ভেতরে ঢুকে) স্যার, গত দুদিন আমি পারিবারিক ঝামেলার কারণে ঠিকমতো পার্সেল ডেলিভারি দিতে পারিনি। প্লিজ আমার চাকরিটা...
এমডি স্যার: (হাসিমুখে চেয়ার থেকে উঠে এসে আসিফের হাত ধরেন) আরে আসিফ সাহেব! বসুন। আপনি ভাবছেন আপনার চাকরি চলে গেছে? একদমই না। আমাদের কুরিয়ার সার্ভিসের ইতিহাসে আপনার মতো সৎ, শিক্ষিত এবং ডেডিকেটেড ছেলে আমরা খুব কম দেখেছি। আপনি এমএ পাস করে যে নিষ্ঠার সাথে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন, তা প্রশংসনীয়।
আসিফ: (অবাক হয়ে) স্যার... মানে?
এমডি স্যার: আমাদের ঢাকা জোনের 'লজিস্টিকস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন এরিয়া ম্যানেজার' পদটি খালি হয়েছে। আমরা আপনার সততা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করে আপনাকে এই পদে প্রমোট করছি। আজ থেকেই আপনার জয়েনিং। এখন থেকে আর আপনাকে রাস্তায় ঘুরতে হবে না, আপনি পুরো জোনের সাপ্লাই চেইন কন্ট্রোল করবেন! আর আপনার বেতনও আগের চেয়ে তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হলো।
(অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে আরিফ দরজার ফাঁক দিয়ে সব শুনছিল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সুমি পাত্রপক্ষের কাছে আসিফকে নিয়ে যে মিথ্যা অহংকার করেছিল, আজ সততার জোরে আসিফ সত্যি সত্যিই সেই সম্মানের পদে আসীন হলো।)
(দৃশ্য ৪: টিনের বাড়ির উঠোন - সন্ধ্যা)
আসিফ আর আরিফ একসাথে বাড়িতে ফেরে। আরিফকে দেখে ফাতেমা বেগম আর মায়া ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। আরিফ সবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে।
আরিফ: আম্মা, মায়া... আমাকে তোমরা মাফ করে দাও। আমি সুমির কথায় অন্ধ হয়ে এই পরিবারের রোদটুকু কেড়ে নিয়েছিলাম। আজ আসিফ ভাইয়া যদি না থাকত, আমি হয়তো জেলেই পচে মরতাম।
মায়া: (আরিফকে টেনে তুলে) ধুর পাগল! তুই তো আমাদের ছোট ভাই। একটু ভুল করেছিলি, তাই বলে কি মেজ ভাইয়াকে আমরা পর করে দিতে পারি?
আসিফ: (আরিফের কাঁধে হাত রেখে) এবার আমাদের নতুন করে লড়াই শুরু করতে হবে আরিফ। সায়মনকে পুলিশ খুব দ্রুতই ধরবে। আর আমি যে নতুন চাকরিটা পেয়েছি, তার টাকা আর তোর জমানো টাকা দিয়ে আমরা ব্যাংকের লোন আস্তে আস্তে শোধ করে দেব। আমাদের 'রোদ-ছায়ার উঠোন' আবার আগের মতো হাসিতে ভরে উঠবে।
(দৃশ্য ৫: হাসপাতালের কেবিন - রাত)
রাশেদ সাহেবকে আইসিইউ থেকে সাধারণ কেবিনে দেওয়া হয়েছে। ওনার জ্ঞান ফিরেছে। পুরো পরিবার ওনার বিছানার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওনার মুখে অক্সিজেনের মাস্ক খোলা। রাশেদ সাহেব আসিফের দিকে তাকালেন।
রাশেদ সাহেব: (দুর্বল কণ্ঠে, চোখে জল) আসিফ... আমি তোকে চিনতে ভুল করেছিলাম বাবা। আমি ভেবেছিলাম তুই ঘরে বসে আমাদের ওপর বোঝা হয়ে আছিস। কিন্তু তুই-ই আজ আমার পুরো পরিবারকে রাস্তায় নামা থেকে বাঁচালি। তুই আমার শ্রেষ্ঠ সন্তান।
আসিফ: (বাবার হাতটা নিজের কপালে ঠেকিয়ে) বাবা, সন্তানের কাছে মা-বাবার সম্মান আর পরিবারের চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না। আপনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুন, আমাদের নতুন টিনের বাড়িটা ছোট হতে পারে, কিন্তু সেখানে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।
(পুরো পরিবার একসাথে হাত মিলিয়ে হাসিমুখে দাঁড়ায়। পেছনের জানলা দিয়ে আকাশের চাঁদের আলো এসে তাদের ওপর পড়ে, যেন এক বুক ভরা শান্তির রোদ্দুর নেমে এসেছে তাদের জীবনে।)
🎨 [সমাপ্তি]
নাটকের শেষ বার্তা: ধন-সম্পদ, অহংকার আর হিংসা মানুষকে সাময়িক সুখ দিতে পারে, কিন্তু জীবনের আসল রোদ লুকিয়ে থাকে পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ, সততা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মায়ার বাঁধনে।