Wednesday, 1 July 2026

নাটকঃ সংসার। রচনাঃকিশোর দুলাল রায়

নাটকের নাম: সংসার

রচনাঃ কিশোর দুলাল রায় 

চরিত্রসমূহ:

১. রহমান সাহেব (৬০): অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরিজীবী। পরিবারের বটগাছ।

২. রাবেয়া বেগম (৫৫): রহমানের স্ত্রী। সংসারী, কিছুটা অভিমানী কিন্তু মমতাময়ী।

৩. আসিফ (২৮): বড় ছেলে। কর্পোরেট চাকরি করে, সারাক্ষণ ব্যস্ত ও মানসিক চাপে থাকে।

৪. মিতু (২৪): আসিফের স্ত্রী। আধুনিক কিন্তু দায়িত্বশীল।

৫. আকাশ (২২): ছোট ছেলে। ভার্সিটিতে পড়ে, কিছুটা চঞ্চল ও আবেগপ্রবণ।

দৃশ্য ১: সকালের চায়ের টেবিল (হাসি ও খুনসুটি)

সময়: সকাল ৮:০০ টা।

স্থান: ড্রয়িং কাম ডাইনিং রুম।

(মঞ্চ বা স্ক্রিন ওপেন হতেই দেখা যাবে রাবেয়া বেগম টেবিলে নাস্তা রাখছেন। রহমান সাহেব চশমা নাকে দিয়ে পত্রিকা পড়ছেন। আকাশ এসে ডাইনিং চেয়ারে ধপ করে বসল।)

আকাশ: মা! ও মা! জলদি খেতে দাও। আজকে ভার্সিটিতে প্রেজেন্টেশন আছে। লেট হলে স্যার কুচকুচ করে নাম্বার কেটে দেবে!

রাবেয়া: (রান্নাঘর থেকে আসতে আসতে) চিল্লাসনে তো সকাল সকাল। এই নে তোর ডিম পোচ আর পরোটা। তোর বড় ভাইয়া আর বৌমা কই?

আকাশ: ভাইয়া তো ওয়াশরুমে বসেও মনে হয় ল্যাপটপে টাইপ করে। আর ভাবি বোধহয় সাজগোজ করছে।

রহমান: (পত্রিকা থেকে চোখ সরিয়ে) আকাশ, বড়দের নিয়ে ওভাবে কথা বলতে নেই। আর তোর পড়াশোনার কী খবর? খালি তো দেখি গিটার নিয়ে টুংটাং করিস।

আকাশ: আব্বা, মিউজিক হলো আত্মার খোরাক। তুমি বুঝবে না।

(এমন সময় আসিফ ফোনে কথা বলতে বলতে তাড়াহুড়ো করে ঢোকে। তার পেছনে মিতু পানির বোতল আর টিফিন বক্স নিয়ে আসে।)

আসিফ: (ফোনে) হ্যাঁ স্যার, আমি জ্যামে পড়ার আগেই পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। ফাইলটা রেডি। (ফোন রেখে) মা, আমি শুধু এক কাপ চা খাব। নাস্তা করার সময় নেই।

মিতু: আসিফ, খালি পেটে অফিসে গেলে আবার গ্যাস্ট্রিকের ব্যথায় চিল্লাবে। দুটো মুখে দাও।

আসিফ: (বিরক্ত হয়ে) মিতু, প্লিজ! চিল্লাই আমি? তুমি বুঝবে না আমার কাজের প্রেশার কত!

রাবেয়া: (ধমকের সুরে) আসিফ! মিতুর ওপর এভাবে ঝাড়ছিস কেন? ও তো তোর ভালোর জন্যই বলছে।

রহমান: থাক মা মিতু, ওকে জোর করো না। ও এখন বড় অফিসার, আমাদের কথার দাম ওর কাছে কম।

(আসিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চা না খেয়েই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়। মিতুর মুখটা কালো হয়ে যায়। আকাশ পরিস্থিতি হালকা করতে গান গেয়ে ওঠে— "সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে..."। রাবেয়া আকাশকে হালকা চড় মারে। সবাই হেসে ওঠে, কিন্তু মিতুর হাসির পেছনে একটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে থাকে।)

দৃশ্য ২: মধ্যরাত (অফিসের চাপ ও দূরত্ব)

সময়: রাত ১১:৩০ টা।

স্থান: আসিফ ও মিতুর বেডরুম।

(মিতু বিছানায় বসে বই পড়ছে। আসিফ রুমে ঢোকে। টাইটা আলগা করে বিছানায় ক্লান্ত হয়ে বসে।)

মিতু: ফ্রেশ হয়ে নাও, খাবার গরম করে আনছি।

আসিফ: ক্ষুধা নেই মিতু। ক্লায়েন্ট মিট ছিল, ওখানেই খেয়েছি।

মিতু: (বইটা বন্ধ করে) প্রতিদিন একই কথা। এই পরিবারে তোমার ভূমিকাটা ঠিক কী আসিফ? শুধু টাকা পাঠানো? বাবা-মা তোমার সাথে দুটো কথা বলার জন্য বসে থাকে। আর আমার সাথে তো তোমার কথাই হয় না।

আসিফ: (উত্তেজিত হয়ে) মিতু, আমি কি বাইরে গিয়ে মার্বেল খেলি? এই যে এত বড় ফ্ল্যাটের ইএমআই, বাবার ওষুধের খরচ, আকাশের সেমিস্টার ফি—এগুলো কোথা থেকে আসে? আমি রোবটের মতো খাটছি এই সংসারের জন্য!

মিতু: সবাই টাকা চায় না আসিফ, একটু সময় চায়। একটু মানসিক শান্তি চায়। তোমার এই রুক্ষ ব্যবহার একটা দিন এই সংসারটাকে ভেঙে দেবে।

আসিফ: ভেঙে দিলে দিক! আমি ক্লান্ত। প্রতিদিনের এই ঘ্যানঘ্যান আমার আর ভালো লাগে না!

(আসিফ বালিশ নিয়ে সোফায় গিয়ে শোয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মিতু বিছানায় মুখ লুকিয়ে কাঁদতে শুরু করে। পাশের ঘর থেকে রহমান সাহেব ও রাবেয়া বেগম এই ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পান। দুজনের মুখেই চরম উদ্বেগের ছাপ।)

দৃশ্য ৩: আকস্মিক ঝড় (বেদনা ও আবেগ)

সময়: দুপুর ২:০০ টা (কয়েকদিন পর)।

স্থান: ড্রয়িং রুম।

(হঠাৎ কলিং বেল জোরে বাজতে থাকে। আকাশ হন্তদন্ত হয়ে দরজা খোলে। দেখে মিতু কাঁদছে, তার হাত কাঁপছে।)

আকাশ: ভাবি! কী হয়েছে? তুমি কাঁদছ কেন?

মিতু: (কেঁদে ফেলে) আকাশ... আব্বা... আব্বা অফিসে যাওয়ার পথে হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে রাস্তায় পড়ে গেছেন। মানুষজন ওনাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে গেছে।

রাবেয়া: (ভেতর থেকে এসে চিৎকার করে ওঠেন) একী বলছিস তোরা! আমার কর্তার কী হয়েছে? ও আল্লাহ!

(পুরো পরিবারে স্তব্ধতা নেমে আসে। আকাশ তৎক্ষণাৎ আসিফকে ফোন দেয়।)

আকাশ: (ফোনে) ভাইয়া! জলদি ল্যাবএইড হসপিটালে আসো। আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে! সিসিইউতে নেওয়া হয়েছে।

[স্থান পরিবর্তন: হাসপাতালের করিডোর]

(সবাই করিডোরে অপেক্ষা করছে। রাবেয়া বেগম জায়নামাজে বসে কাঁদছেন। আসিফ ছুটে আসে। তার চুল উসকোখুসকো, চোখে জল।)

আসিফ: মা! আব্বা কেমন আছে? ডাক্তার কী বলল?

আকাশ: (রাগ ও ক্ষোভে) এখন এসে কী হবে ভাইয়া? আব্বা গত তিনদিন ধরে বুক ব্যথার কথা বলছিল। তুমি তো ল্যাপটপ থেকে চোখ সরানোর সময় পাওনি! আব্বা বলছিল, "আমার বড় ছেলেটা এত ব্যস্ত, ওরে ডিস্টার্ব করিস না।"

আসিফ: (স্তব্ধ হয়ে যায়) আব্বা... আব্বা এ কথা বলেছে?

মিতু: (এগিয়ে এসে) হ্যাঁ আসিফ। তুমি এই সংসারের জন্য টাকা রোজগার করেছ সত্যি, কিন্তু সংসারের মানুষগুলোর দিকে তাকানোর সময় তোমার ছিল না। আজ যদি বাবার কিছু হয়ে যায়, তুমি কি তোমার টাকা দিয়ে বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে?

(আসিফ হাসপাতালের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে, ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটতে গিয়ে সে কতটা একা হয়ে গেছে এবং তার আসল সম্পদকে অবহেলা করেছে।)

দৃশ্য ৪: পুনর্মিলন (সুখ ও উপলব্ধি)

সময়: তিন সপ্তাহ পর, বিকেল ৫:০০ টা।

স্থান: বাড়ির ছাদ বা বারান্দা (যেখানে গাছপালা আছে)।

(রহমান সাহেব এখন সুস্থ। তিনি একটা ইজি চেয়ারে বসে আছেন। রাবেয়া বেগম পাশে বসে ওনাকে ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। আকাশ কোণায় বসে গিটার টিউন করছে। মিতু চা নিয়ে আসে। আসিফ অফিস থেকে আজ অনেক তাড়াতাড়ি ফিরেছে। তার হাতে এক ঠোঙা জিলিপি আর বাবার প্রিয় বেলি ফুলের মালা।)

আসিফ: (বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে) আব্বা, আজকে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এলাম। আপনার পছন্দের গরম গরম জিলিপি এনেছি। আর মায়ের জন্য বেলি ফুল।

রাবেয়া: (মুচকি হেসে) সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছিল রে বাবা?

রহমান: (আসিফের হাতটা ধরে) তোকে আজ অনেকদিন পর শান্ত দেখাচ্ছে বাবা। অফিস থেকে ছুটি পেয়েছিস?

আসিফ: না আব্বা। বসকে বলে দিয়েছি—দিনের শেষে কাজটা আমার পেশা, কিন্তু আপনারা আমার প্রাণ। জীবনের ব্যালেন্সটা করতে বড্ড দেরি করে ফেলেছিলাম। মিতু, আমাকে মাফ করে দিও।

(মিতু চোখের কোণের জল মুছে হেসে ফেলে এবং আসিফের হাতে চায়ের কাপ দেয়। আকাশ গিটার বাজিয়ে আনন্দের সুর তোলে।)

রহমান: (সবার দিকে তাকিয়ে) সংসার মানে শুধু একটা ছাদের নিচে থাকা নয়। সংসার হলো একে অপরের সুখ-দুঃখে ভাগীদার হওয়া, একে অপরের ভুলগুলো ক্ষমা করে দেওয়া। আজ আমার সংসারটা সত্যি পূর্ণ হলো।

(সবাই একসাথে হাসিমুখে ফ্রেমবন্দি হয়। ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি আবেগঘন হালকা সুর বাজতে থাকে।)

-- সমাপ্ত --

No comments:

Post a Comment